কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে নোবেলজয়ীদের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। ইতালির ভ্যাটিকান সিটিতে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলি’র সমাপনী দিনে তিনি এ ঘোষণাপত্রে সই করেন।
১৬ থেকে ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রকাশিত ‘Humanity at the Threshold’ শীর্ষক ঘোষণাপত্রে সতর্ক করা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বয় মানবজাতির জন্য নজিরবিহীন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে বলা হয়, এআইভিত্তিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে মানবসভ্যতা গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, পারমাণবিক কমান্ড ব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়াতে এবং তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আস্থা ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এই প্রযুক্তি।
সম্মেলনে প্রফেসর ইউনূস ছাড়াও নোবেলজয়ী রোমানো প্রোদি, জোডি উইলিয়ামস, মারিয়া রেসা, ডেনিস মুকওয়েগে এবং হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ভ্যাটিকানের কাস্তেল গানদোলফোর বর্গো লাউদাতো সি’ প্রাঙ্গণে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রফেসর ইউনূস। পরে তিনি ‘Artificial Intelligence, Democracy and the Economic Revolution: Toward a New World Order’ শীর্ষক অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন।
সম্মেলনের ফাঁকে তিনি সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আর্চপ্রিস্ট ও ফ্যাব্রিক অব সেন্ট পিটারের সভাপতি কার্ডিনাল মাউরো গামবেত্তি এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মহাপরিচালক ড. কু দংইউর সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
যৌথ ঘোষণাপত্রে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—এআই ও পারমাণবিক অস্ত্রকে কেন্দ্র করে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, এআই প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তে এআইয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, জাতিসংঘের অধীনে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামো গঠন, তরুণদের দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারে সম্পৃক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাচাইযোগ্য উপায়ে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার উদ্যোগ জোরদার করা।
ঘোষণাপত্রের শেষাংশে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ও বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ঐতিহাসিক আহ্বান—‘তোমাদের মানবতাকে স্মরণ করো, বাকিটা ভুলে যাও’—উদ্ধৃত করে বলা হয়, বর্তমান প্রজন্মের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতার নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব নির্ধারণ করবে।

















