• Home
  • মতামত
  • ভাইভা প্রত্যাশী ১৩৪০ ভবিষ্যৎ আইনজীবীর অপেক্ষার অবসান হোক
Image

ভাইভা প্রত্যাশী ১৩৪০ ভবিষ্যৎ আইনজীবীর অপেক্ষার অবসান হোক

অ্যাডভোকেট ইউনুস মল্লিক— আদালতের রায় কেবল কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অধিকার, স্বপ্ন ও ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়। আদালত যখন কারও ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেন, তখন সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের। কিন্তু রায় ঘোষণার পরও যদি সেই অধিকার দীর্ঘ অপেক্ষা, নীরবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার আড়ালে আটকে থাকে, তবে বিচারপ্রার্থীর কাছে ন্যায়বিচারই হয়ে ওঠে আরেক দফা অপেক্ষার নাম। কারণ একটি রায়ের প্রকৃত মর্যাদা তার ঘোষণায় নয়, বরং তা কত দ্রুত ও যথাযথভাবে মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত হলো—তার মধ্যেই নিহিত।

এই কথাগুলো অবতারণা করার কারণ হলো—সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির লিখিত পরীক্ষার প্রথম রিভিউয়ের ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। মহামান্য আদালত নির্দেশ দেন—প্রথম রিভিউয়ে উত্তীর্ণ ১৩৪০ জন পরীক্ষার্থীর ফল বৈধ হিসেবে গণ্য করে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে তাঁদের ভাইভা (মৌখিক পরীক্ষা) গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। হাইকোর্টের এই রায় কেবল কিছু বঞ্চিত পরীক্ষার্থীর আইনি অধিকার ফিরিয়ে দেয়নি, বরং প্রশাসনিক ন্যায়পরায়ণতা এবং আইনের শাসনের মৌলিক নীতিকেই পুনপ্রতিষ্ঠা করেছিল।

পরবর্তীতে এই উত্তীর্ণদের মধ্যে থেকে দুজন পরীক্ষার্থী দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ সহ্য না করতে পেরে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে বর্তমানে ১৩৩৮ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবী এই রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আদালতের স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও আজ প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও রায়ের বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। ১৩৩৮ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবী আজও একটি মাত্র ভাইভার সময়সূচির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন। এই দীর্ঘ নীরবতা কেবল একটি প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি একেকটি জীবন, একেকটি পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর হতাশা, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং এক অসীম অনিশ্চয়তার দিকে।

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—১৩৩৮ কেবল একটি গাণিতিক সংখ্যা নয়। এই প্রতিটি সংখ্যার পেছনে জড়িয়ে আছে একেকটি তরুণ প্রাণ, তাদের বছরের পর বছর ধরে জমানো ঘাম আর ত্যাগ, পরিবারের সীমাহীন প্রত্যাশা এবং একটি স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পাঠ শেষ করে, কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে এবং পরবর্তীতে নিজেদের অধিকারের জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যখন আদালতের রায়ে তারা ন্যায়বিচার পেলেন, ঠিক তখনই যদি প্রাতিষ্ঠানিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে তাদের পেশাজীবনের পথ থমকে যায়—তবে তা আর সাধারণ বিলম্ব থাকে না; তা রূপ নেয় এক গভীর মানবিক বেদনায়।

আইনশাস্ত্রের এক চিরন্তন সত্য নীতি হলো—‘Justice delayed is justice denied’ অর্থাৎ বিলম্বে ন্যায়বিচার পাওয়া প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার বঞ্চনারই নামান্তর। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কেবল আইনজীবী তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আইন পেশার অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক। বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যার অবদান সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই আদালতের রায়ের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও দ্রুত পদক্ষেপ আশা করে সমাজ। কারণ অভিভাবকের আচরণই তো ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের শেখাবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নীতি-নৈতিকতা। এটি কারও ব্যক্তিগত সম্মান বা প্রাতিষ্ঠানিক অহংকারের বিষয় নয়; এটি আমাদের সংবিধান, বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসনের প্রতি যৌথ দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

এই ঝুলন্ত অনিশ্চয়তার সবচেয়ে করুণ আঘাত লেগেছে এই তরুণ শিক্ষানবিশদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। তারা আজ কর্মহীন, পরিবারের বোঝা হয়ে থাকার গ্লানি বহন করছেন। কেউবা পরিবারের একমাত্র আশা, কেউ বিপুল অর্থ ঋণ করে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন, আবার কেউ জীবনের সব সুযোগ থমকে রেখে পথ চেয়ে আছেন একটাই স্বপ্নের—আইনজীবী হিসেবে গাউন পরে আদালতে দাঁড়াবেন। তাদের জীবনের এই মূল্যবান দিনগুলো যারা হারিয়ে যাচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

এই অনিশ্চয়তা কীভাবে তাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তার মর্মান্তিক উদাহরণ আমরা সম্প্রতি দেখেছি। বরগুনা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের শিক্ষানবিশ আইনজীবী মিজানুর রহমান আদালতের রায়ে প্রথম রিভিউয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু রায় বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং নানা ভুয়া গুজবের মুখে পড়ে তিনি তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। অবশেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বেদনার রেশ কাটতে না কাটতেই কুমিল্লা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের আরেক রিভিউ উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ মকবুল হোসেনও আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। হয়তো এই মৃত্যুগুলোর দোষ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওপর সরাসরি চাপানো যাবে না, কিন্তু দীর্ঘায়িত হতাশা, পারিবারিক চাপ আর মানসিক যন্ত্রনাই যে তাদের অকালে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে—তা তো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই মৃত্যুগুলো আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন রেখে যায়: এই বিলম্বের মূল্য আর কতগুলো জীবন দিয়ে শোধ করতে হবে?

আইনি প্রক্রিয়া যদি কোনো কারণে স্থগিত থাকে, তবে তা স্বচ্ছতার সঙ্গে জানানোর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের। একটি দায়িত্বশীল ও অভিভাবকতুল্য প্রতিষ্ঠানের কাছে সমাজ সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও মানবিক যোগাযোগ প্রত্যাশা করে।

এরই মাঝে আরও একটি গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথম রিভিউয়ে উত্তীর্ণ ১৩৪০ জনের ভাইভা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা না দিয়ে বার কাউন্সিল নতুন একটি এনরোলমেন্ট পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে আগামী ২২ আগস্ট নতুন প্রক্রিয়ার লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী, একজন পরীক্ষার্থী এমসিকিউ পাসের পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ দুবার লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।

এখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ও নির্মম জটিলতা। আদালতের রায়ে প্রথম রিভিউতে উত্তীর্ণ হলেও বার কাউন্সিল দ্বিতীয় রিভিউতে অনুত্তীর্ণ হওয়া ১৩৪০ জনের অনেকেরই আবার নতুন লিখিত পরীক্ষায় বসার আইনি সুযোগ রয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—উচ্চ আদালতের রায়ে যে পরীক্ষায় তারা ইতিমধ্যেই মেধার স্বাক্ষর রেখে উত্তীর্ণ হয়েছেন, একটিমাত্র সনদের জন্য একই লিখিত পরীক্ষায় কি তাদের পুনরায় বসা সমীচীন? একজন পরীক্ষার্থী কি ভাইভার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেবেন, নাকি পূর্বে পাস করা পরীক্ষায় আবারও নতুন করে বসবেন?

ফলে, প্রথম রিভিউয়ে উত্তীর্ণরা আজ এক চরম দ্বিমুখী সংকট ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় পড়েছেন। তারা কি এখন ভাইভার জন্য মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবেন, নাকি ২২ আগস্টের নতুন লিখিত পরীক্ষার পড়ার টেবিলে বসবেন? এই দোটানা এবং বিভ্রান্তি দূর করা অভিভাবক হিসেবে বার কাউন্সিলেরই নৈতিক দায়িত্ব। একটি মাত্র আনুষ্ঠানিক নোটিশই পারে এই ১৩৪০ জন তরুণের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং তাঁদের মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে।

আমরা অত্যন্ত বিনীতভাবে ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ার অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, সুপ্রীম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলীসহ আইন অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনারা বিচার ব্যবস্থা ও আইনি অঙ্গনের অভিভাবক। বিষয়টির তীব্র মানবিক, সংবিধানিক ও আইনি সংকট বিবেচনা করে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির সম্মানিত দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে বিনীত আবেদন—মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনাকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে এই ১৩৪০ জন রিভিউ উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীর ভাইভার সময়সূচি ঘোষণা করুন। কারণ, এই রায় বাস্তবায়নে দেরি হলে কেবল ১৩৪০ জন তরুণ আইনজীবীর স্বপ্নই ভাঙবে না; ভেঙে পড়বে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

লেখক: আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা এবং পরিচালক, মল্লিক ল’ একাডেমি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »