আল আমিন-কিছুদিন আগে একটি সংবাদে দেখা গেল—ষষ্ঠ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী বাংলা বইয়ের সাধারণ রিডিংও সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না। সংবাদটি পড়ে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন, কেউ হতাশ হয়েছেন, কেউ আবার দ্রুত দায় খোঁজার চেষ্টা করেছেন। কেউ বলছেন শিক্ষকের ব্যর্থতা, কেউ বলছেন পরিবারের উদাসীনতা, আবার কেউ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করছেন।
কিন্তু বিষয়টি আসলে কোনো একক ব্যর্থতার গল্প নয়। একজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে হঠাৎ করে পড়তে ভুলে যায় না। এই অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনে থাকে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা শেখার ঘাটতি, দুর্বল মূল্যায়ন ব্যবস্থা, প্রাইভেট নির্ভরতা এবং কখনও কখনও এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়া শেখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাধারণভাবে একজন শিশু দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে উঠতেই পড়া, লেখা এবং মৌলিক রিডিং দক্ষতা অর্জন করে ফেলে। এই সময়টাতেই তৈরি হয় ভাষা বোঝার ক্ষমতা, শব্দ চেনার অভ্যাস, বাক্য গঠনের দক্ষতা এবং নিজের চিন্তা প্রকাশের ভিত্তি।
তাই একজন শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও বাংলা বই খুলে সাবলীলভাবে পড়তে না পারে, তাহলে প্রশ্নটা শুধু শিক্ষার্থীর নয়—প্রশ্নটা শেখানোর পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে।
আমরা প্রায়ই পরীক্ষার ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হয়ে যাই। রিপোর্ট কার্ডে ভালো নম্বর, পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া—এসবই যেন সফলতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী সত্যিই পড়তে পারছে কি না, সে যা পড়ছে তা বুঝতে পারছে কি না—এই প্রশ্নগুলো অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
একজন শিশু যদি বই পড়ে বুঝতেই না পারে, তাহলে সে শুধু বাংলায় নয়—গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান—সব বিষয়েই ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে শুরু করবে। কারণ শিক্ষা শুরু হয় ভাষা দিয়ে। পড়তে না পারলে শেখাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে, যা নিয়ে অনেক পরিবার নীরবে কথা বলে—প্রাইভেট নির্ভরতা।
অনেক অভিভাবকের মধ্যে এখন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিদ্যালয়ের ক্লাস যথেষ্ট নয়, অতিরিক্ত প্রাইভেট ছাড়া শেখা সম্ভব না। যদিও সব শিক্ষককে একইভাবে বিচার করা ন্যায্য নয়, তবুও সমাজে এই ধারণার বিস্তার নিজেই একটি প্রশ্ন তৈরি করে।
যদি নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে, পাঠ্যবই হাতে নিয়ে, শ্রেণিকক্ষে সময় কাটিয়েও একজন শিক্ষার্থী আলাদা টিউশন ছাড়া শেখায় পিছিয়ে পড়ে—তাহলে আমাদের ভাবতে হবে, কোথাও কি মূল শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে?
প্রাইভেট শিক্ষা একসময় ছিল অতিরিক্ত সহায়তা। কিন্তু ধীরে ধীরে অনেক ক্ষেত্রে সেটি প্রয়োজনীয়তার জায়গা নিয়ে নিয়েছে। ফলে যে পরিবার অতিরিক্ত খরচ করতে পারে না, তাদের সন্তান শুরু থেকেই অসুবিধায় পড়ে।
এই বৈষম্য ভয়ংকর। কারণ শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল সমতার জায়গা। অথচ বাস্তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা শেখার মান নির্ধারণ করতে শুরু করলে সেটি সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখন সামনে এসেছে। সরকার চলমান বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তৃতীয় ভাষা যুক্ত করার উদ্যোগ বা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় একাধিক ভাষা শেখা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক চিন্তা। বর্তমান বিশ্বে ভাষাগত দক্ষতা কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষায় নতুন সুযোগ তৈরি করে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে।
যে শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও কিছু শিক্ষার্থী নিজের মাতৃভাষার পাঠ সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না, সেখানে নতুন ভাষা যুক্ত করার আগে কি আমাদের নিশ্চিত হওয়া উচিত নয় যে প্রতিটি শিশু অন্তত নিজের ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্ন তৃতীয় ভাষার বিরোধিতা নয়। বরং এটি অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন।
যে শিশুর হাঁটা শেখা হয়নি, তাকে দৌড় শেখানোর চেষ্টা করলে সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। যে শিক্ষার্থী নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশ করতে পারে না, তার কাছে নতুন ভাষা শেখা অনেক সময় দক্ষতা নয়, বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলা ও ইংরেজিতে মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত না করে তৃতীয় ভাষা যুক্ত করা হলে সেটি হয়তো শহরের কিছু শিক্ষার্থীর জন্য সুযোগ তৈরি করবে, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নতুন ধরনের শিক্ষাগত বৈষম্যও তৈরি করতে পারে।
আমাদের শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই নতুন বই, নতুন কারিকুলাম, নতুন বিষয় নিয়ে উৎসাহ দেখা যায়। কিন্তু অনেক সময় সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি চাপা পড়ে যায়—শিশু কি সত্যিই শিখছে?
শিক্ষা মানে শুধু বিষয় বাড়ানো নয়, শিক্ষা মানে শেখার ক্ষমতা তৈরি করা।
একজন শিক্ষার্থী যদি কম বিষয় পড়ে কিন্তু গভীরভাবে বুঝতে পারে, সেটি অনেক সময় বেশি মূল্যবান—তুলনায় এমন শিক্ষার, যেখানে বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু শেখার মান বাড়ছে না।
আজ প্রয়োজন দায় চাপানোর নয়, আত্মসমালোচনার। প্রয়োজন নিশ্চিত করা—তৃতীয় শ্রেণির মধ্যেই প্রতিটি শিশু পড়তে পারছে কি না, বুঝতে পারছে কি না, নিজের ভাষায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারছে কি না।
কারণ একজন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী বাংলা রিডিং পড়তে না পারা শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
আমরা কি শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের শেখাচ্ছি, নাকি শুধু শ্রেণি পার করাচ্ছি?
আমরা কি ভাষার সংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি শেখার ভিত্তি তৈরি করছি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই হয়তো আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আল আমিন, প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ

















