কাউনিয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী তাল গাছ হারিয়ে যাচ্ছে

একসময় শুধু গল্প-কবিতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে

0
3

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি: বাংলার প্রকৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ তালগাছ আজ রংপুরের কাউনিয়ায় বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামের রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুকুরপাড় ও মাঠজুড়ে সারি সারি তালগাছ দেখা গেলেও এখন নির্বিচারে গাছ কাটা ও নতুন চারা রোপণের অভাবে দিন দিন কমে যাচ্ছে এ উপকারী বৃক্ষ।

কবি-সাহিত্যিকদের কবিতায় স্থান পাওয়া তালগাছ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি প্রাকৃতিক বজ্র নিরোধক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাল, নারিকেল ও খেজুরগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু বর্তমানে এসব গাছ কাটার প্রবণতা বাড়লেও রোপণের উদ্যোগ খুবই কম।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ তালগাছ প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাতো। আগে গ্রামের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার ধারে ও দিঘীপাড়ে অসংখ্য তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখি বাসা বেঁধে সকাল-সন্ধ্যায় মুখরিত করে তুলত পুরো এলাকা। এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে।

লালমসজিদ এলাকার বাসিন্দা বাবু হাজি জানান, “তালগাছ মানুষের অনেক উপকারে আসে। তালের পায়েশ, পিঠা, রস, পাখা, ঘরের ছাউনি থেকে শুরু করে মজবুত কাঠ সবই কাজে লাগে। অথচ এখন মানুষ গাছ কেটে ফেলছে, কিন্তু নতুন করে লাগাচ্ছে না।”তিনি আরও বলেন, তালগাছ ফসলের ক্ষতি করে না এবং দীর্ঘজীবী হওয়ায় পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অতীতে বাড়িঘর নির্মাণে তালের কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। নিজপাড়া গ্রামের সেকেন্দার আলী জানান, রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়কের তিস্তা সেতুর পাশে এখনো কিছু তালগাছ রয়েছে। সেগুলো দ্রæত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে তালুকশাহবাজ গ্রামের প্রয়াত মনছুর আলী ও সাহাবাজ গ্রামের মরহুম নুর হোসেন মাস্টার জীবদ্দশায় পরিবেশের কথা চিন্তা করে নিজ উদ্যোগে বেশ কিছু তালগাছ রোপণ করেছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ তালের বীজ বিতরণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই সেই বীজ থেকে চারা গজাতে দেখা যায়নি। কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আকতার বলেন, “যেভাবে তালগাছ কাটা হয়েছে, সেভাবে রোপণ করা হয়নি। তবে এ বছর সরকারি উদ্যোগে কিছু তালবীজ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

সচেতন মহলের দাবি, তালগাছের উপকারিতা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারিভাবে ব্যাপক রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই বৃক্ষ একসময় শুধু গল্প-কবিতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY