ফলাফল সব সময় একটি যাত্রার পুরো গল্প বলে না। বাংলাদেশের হয়ে হামজা চৌধুরীর প্রথম দেড় বছরও তেমন। জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরে এই সময়টায় তিনি ধীরে ধীরে চিনেছেন একটি দলকে। যে দলটিও এখন ধীরে ধীরে নিজের একটা কাঠামো তৈরি করছে।
সিঙ্গাপুরের কাছে ফিফা আসিয়ান কাপে ১-০ গোলে হারের পর ফিফার কাছে সেই পথচলার কথাই বলেছেন বাংলাদেশের এই মিডফিল্ডার।জাতীয় দলের হয়ে সময়টা যে উত্থান-পতনে ভরা, সেটি স্বীকার করেছেন হামজা। এখন পর্যন্ত সাফল্যের চেয়ে কঠিন সময়ই বেশি গেছে বলে মনে করেন তিনি। তবে তাতে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই তার।
বরং আরও বড় কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন বলে মনে করেন শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই খেলোয়াড়।
ফিফাকে হামজা বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এটি অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা। আলহামদুলিল্লাহ। অবশ্যই উত্থান-পতন ছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত ভালো সময়ের চেয়ে কঠিন সময়ই সম্ভবত বেশি গেছে। তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং আরও ভালো কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দলকে গড়ে তুলছি। ’বাংলাদেশ এখনও নিজেদের গড়ে তোলার পর্যায়ে আছে। হামজার মতে, আসিয়ান কাপের মতো টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতার দিক থেকে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ। এতে চাপ যেমন থাকে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করে আরও বেড়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হয়।
হামজার কাছে বাংলাদেশের উন্নতি শুধু ফলাফলে ধরা পড়ে না। বরং বেশি অভিজ্ঞ এবং ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতাতেও সেই অগ্রগতির ছাপ রয়েছে, ‘আমার মনে হয়েছে, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আমরা আরও ভালো ছিলাম। ’
আরও যোগ করে বলেছেন, ‘মালয়েশিয়া খুব ভালো একটি দল। আর আমার মনে হয়, আমরা ওই ম্যাচটি খুব ধীরগতিতে শুরু করেছিলাম। যে কারণে তাদের মতো মানসম্পন্ন একটি দলের বিপক্ষে ম্যাচে ফিরে আসাটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। ’
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ধাপ এগিয়ে। তবে মাঠের লড়াইয়ে সেই ব্যবধান সব সময় দৃশ্যমান ছিল না বলেই মনে করেন হামজা। তার ভাষায়, ‘আমাদের জন্য এই পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারাটা দারুণ। র্যাঙ্কিংয়ে তারা আমাদের ওপরে। কিন্তু মাঠের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্ত দেখলে আসলে এই ব্যবধানটা বোঝা যায় না। সুতরাং আমরা নিশ্চয়ই কিছু একটা ঠিকঠাক করছি। ’
হামজার বিশ্বাস, বাংলাদেশের যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে আরও কিছু বিষয় ঠিকঠাকভাবে মেলাতে হবে। শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা ধাঁধার শেষ দুই-তিনটি টুকরো খুঁজছি। আশা করি, সেগুলো আমরা নিখুঁতভাবে একসঙ্গে জোড়া লাগাতে পারবো। ’
সামনেই অবশ্য আরও বড় একটি লক্ষ্য। নভেম্বরে ঘরের মাঠে একটি বড় টুর্নামেন্ট খেলবে বাংলাদেশ। এতদিনের গড়ে তোলা ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে সেখানে নিজেদের আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেখছেন হামজা। তিনি বলেছেন, ‘নভেম্বরে ঘরের মাঠে আমাদের বড় একটি টুর্নামেন্ট আছে। তাই ইনশাআল্লাহ, আমরা সেটির জন্যই নিজেদের তৈরি করছি এবং আশা করি, সেখানে কিছু সাফল্য অর্জন করতে পারব। ’
বাংলাদেশের হয়ে হামজার পথচলায় মাঠের বাইরেও এসেছে নতুন অভিজ্ঞতা। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় এবারই প্রথম পা রেখেছেন তিনি। এর আগে তার বন্ধু ও পরিবারের কয়েকজন সদস্য ইন্দোনেশিয়া ঘুরে গেছেন এবং দেশটির প্রশংসাই করেছেন। এবার নিজে এসে সেই অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে হামজার। তার কথায়, ‘আমার খুব ভালো লেগেছে। সত্যিই খুব ভালো! ইন্দোনেশিয়ায় এটাই আমার প্রথম আসা। আমার অনেক বন্ধু এবং পরিবারের কয়েকজন সদস্য আগে এখানে এসেছেন। তারা এই জায়গা সম্পর্কে শুধু ভালো কথাই বলেছেন। তাই নিজে এখানে আসতে পেরে সত্যিই ভালো লেগেছে। ’
তার মতে, ‘এখানকার মানুষ খুবই বন্ধুসুলভ। আবহাওয়াটা আমার জন্য একটু বেশি গরম। তবে সব মিলিয়ে আমি সত্যিই উপভোগ করেছি। আশা করি, অন্য কোনো সময় আবারও আসতে পারব এবং হয়তো ইন্দোনেশিয়ার অন্য কিছু জায়গাও ঘুরে দেখতে পারবো। ’
এখন অবশ্য হামজার মনোযোগ আবার মাঠের খেলায়। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সামনে ইন্দোনেশিয়া। ম্যাচটিতে দর্শকও থাকবেন বেশি, ফলে পরিবেশও হবে ভিন্ন। বাংলাদেশের জন্য এটি নিজেদের অগ্রগতি যাচাইয়ের আরেকটি সুযোগ। হামজা বলেছেন, ‘আমি সত্যিই ম্যাচটির জন্য অপেক্ষা করছি। আমি জানি, অনেক বেশি দর্শক থাকবে। তাই দল হিসেবে এটি আমাদের জন্য আরেকটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা হবে। ইন্দোনেশিয়া খুব ভালো দল। তাদের অনেক খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলে। তাই এটি আমাদের জন্য আরেকটি কঠিন পরীক্ষা হবে। তবে আমরা এখানে আসার মূল কারণই হলো, এই মুহূর্তে আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। ’



















