চিঠির অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে,
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ একসময় রংপুরের কাউনিয়ার গ্রামীণ জনপদে ডাক পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি ছিল প্রতীক্ষার সুর। সকাল কিংবা দুপুরের নীরবতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসত সেই পরিচিত শব্দ টিং টিং’। কাঁধে ডাকের ব্যাগ ঝুলিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে চলতেন ডাকপিয়ন। আর তাঁর পথ চেয়ে থাকতেন নববধূ, প্রবাসী স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবার কিংবা দূরে থাকা সন্তানের চিঠির আশায় দিন গোনা বৃদ্ধ বাবা-মা।
সেই চিঠিতে শুধু খবর থাকত না; মিশে থাকত মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, দুঃখ-বেদনা আর না-বলা কথার উষ্ণতা। একটি চিঠি পৌঁছাতে কখনো কয়েক দিন, কখনো সপ্তাহ, এমনকি মাসও লেগে যেত। অথচ সেই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দ। প্রিয়জনের হাতের লেখা কয়েকটি শব্দ হাতে পাওয়ার মুহুর্তটি হয়ে উঠত পরিবারের সবার জন্য উৎসবের মতো।
কাউনিয়ার বিভিন্ন গ্রামে একসময় এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। সাইকেলে চড়ে ডাকপিয়ন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে পৌঁছে দিতেন চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, মানিঅর্ডার কিংবা বিদেশে থাকা স্বজনের খবর। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি শোনা মাত্রই পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসতেন উঠানে। মনে হতো আজ বুঝি কাঙ্ক্ষিত চিঠিটি এসেছে!
হাতে লেখা চিঠির আনন্দই ছিল আলাদা। পরিচিত মানুষের হাতের লেখা, কাগজে লেগে থাকা অনুভূতি আর মনের গভীরে জমে থাকা কথাগুলো বারবার পড়েও যেন শেষ হতো না। অনেকেই প্রিয়জনের চিঠি যত্ন করে রেখে দিতেন বছরের পর বছর। সময়ের সঙ্গে কাগজ হলদে হয়ে যেত, কালির দাগ ফিকে হয়ে আসত; কিন্তু মুছে যেত না সেই অক্ষরগুলোর আবেগ। পুরোনো সেই চিঠি হয়ে উঠত জীবনের অমূল্য স্মৃতি।
একটি খাম হাতে পাওয়াকে ঘিরেও তৈরি হতো কত কৌতূহল। কেউ চিঠি কপালে ছুঁইয়ে নিতেন, কেউবা বুকে চেপে ধরতেন। খামের ভাঁজ খুলে চিঠির প্রথম কয়েকটি শব্দ পড়তেই যেন দূরত্ব কিছুটা কমে আসত। প্রতিটি অক্ষরে খুঁজে পাওয়া যেত প্রিয় মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর আর স্পর্শের অনুভূতি।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থা বদলে দিয়েছে মানুষের সেই অপেক্ষার সংস্কৃতি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, মেসেজিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মুহুর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে খবর। ফলে হাতে লেখা চিঠি আর ডাকপিয়নের সেই কদরও হারিয়ে গেছে।
কাউনিয়া সদর পোস্ট অফিস ও শহীদবাগ ইউনিয়ন পোস্ট অফিস ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো চিঠির আনাগোনা নেই। চিঠির অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড়ও নেই ডাকঘরে। ডাকঘরের কার্যক্রম চললেও হারিয়ে গেছে আগের সেই কর্মচঞ্চলতা। যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়ায় ডাকপিয়নের ব্যস্ততাও অনেকটাই কমেছে।
কাউনিয়া পোস্টমাস্টার জহির উদ্দিন বলেন, ‘একসময় দূরের স্বজনের চিঠি এসেছে কি না কিংবা টাকা পাঠিয়েছে কি না সেই খোঁজ নিতে পোস্ট অফিসে শত শত মানুষের আনাগোনা ছিল। এখন সেটি শুধুই অতীত। ডিজিটাল যুগে মুহুর্তেই যোগাযোগ সম্ভব হওয়ায় চিঠির আবেদন অনেক কমে গেছে।’
ডাকপিয়ন লিটন মিয়া বলেন, ‘আগে প্রতিদিনই বিভিন্ন গ্রাম-মহল্লায় চিঠি পৌঁছে দিতে যেতে হতো। ডাকপিয়নের পরিচিত মুখ আর সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়ায় সেই ব্যস্ততা আর নেই।’
হরিশ্বর গ্রামের বাসিন্দা নুর আমিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগে চিঠির জন্য কত অপেক্ষা করতাম! দূর থেকে ডাকপিয়নকে দেখলেই মনে হতো, আমার চিঠি বুঝি আইছে। চিঠি হাতে পেলে বাড়ির সবাই মিলে পড়তাম। এখন মোবাইলের বদৌলতে সেই আনন্দ আর নেই।’
ডাকপিয়ন শুধু চিঠি পৌঁছে দিতেন না; তিনি ছিলেন মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানো এক পরিচিত মুখ, দূরত্বের মাঝে যোগাযোগের সেতুবন্ধন। তাঁর সাইকেলের ঘণ্টির শব্দে কখনো জেগে উঠত আশা, কখনো মিলত প্রিয়জনের খবর, কখনো চোখে আসত আনন্দাশ্রু।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় হয়তো সেই দিন আর ফিরবে না। তবু কাউনিয়ার প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি, হাতে লেখা চিঠির গন্ধ আর প্রিয়জনের অক্ষরে মিশে থাকা ভালোবাসা আজও অমলিন। সময়ের স্রোতে চিঠি হারিয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়ে তার রেখে যাওয়া আবেগের গল্পটি হয়তো কখনো হারাবে না।

















