• Home
  • আন্তর্জাতিক
  • মোদির আশ্বাসেও অশান্ত রাজপথ, কোন পথে ভারতের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন?
Image

মোদির আশ্বাসেও অশান্ত রাজপথ, কোন পথে ভারতের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন?

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ আদালত গঠন করা হবে।

দেশজুড়ে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই বক্তব্যে মোদি বলেন, “প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক এই ইস্যু তার সরকারের তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় জনআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো চলমান বিক্ষোভ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আশ্বাস দেন যে, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে।

এদিকে, একই রাতে ভারতীয় অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক টানা ২৬ দিনের অনশন প্রত্যাহার করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই তিনি এই অনশন কর্মসূচি পালন করছিলেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

শুধু নয়াদিল্লিতেই নয়, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও পাটনাসহ ভারতের বিভিন্ন বড় শহরেও প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

বিক্ষোভের কারণ কী

ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (এনইইটি) প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চলমান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি তরুণদের প্ল্যাটফর্ম। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্মটি এখন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। বিশেষ করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) বিভিন্ন ব্যর্থতার অভিযোগ সামনে আসার পর আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। সিজেপির প্রধান দাবি হলো কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার।

বর্তমানে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর। পার্লামেন্ট স্ট্রিটের কাছাকাছি অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থানে সাধারণত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। গত সোমবার থেকে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট স্ট্রিটের একটি অংশে অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া পার্লামেন্ট হাউস থেকে কনট প্লেস পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও হাজারো শিক্ষার্থী অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

চলতি সপ্তাহে যন্তর মন্তর এলাকায় কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে, এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এ ঘটনার পর যন্তর মন্তরে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় ভারত সরকারের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে— কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং সম্প্রতি পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নফাঁস-সংক্রান্ত হতাশা থেকে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ প্রদান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ২৬ দিন অনশন পালন করেন জলবায়ু ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গভীর রাতে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। এক্সে দেয়া পোস্টে তিনি জানান, সম্ভাব্য সহিংসতা এড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জুনিয়র পারমাণবিক শক্তিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ওয়াংচুক অনশন ভাঙেন। পরে বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বক্তব্যে জে পি নাড্ডা বলেন, “যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো মামলা করবে না।”

পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধ এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে পার্লামেন্টে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলেও তিনি জানান।

ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। তবে চলতি বছরসহ গত পাঁচ বছরে অন্তত তিনবার এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মোদি ও অন্য নেতারা কী বলেছেন?

চলমান আন্দোলনের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আন্দোলনকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর নেতাদের মধ্যে আলোচনায় বসার পর সংকট নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন।

জলবায়ু ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার কয়েক ঘণ্টা পর সরকারের দুই জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং সিজেপির দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার পর উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ খোঁজার ইঙ্গিত মিলেছে।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লাখো তরুণ এখনো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “দেশের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।”

মোদি আরও জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে সরকার বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, “যারা দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।”

শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?

বিক্ষোভ দমাতে প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) একটি জরুরি ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নয়াদিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

এর জবাবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অভিজিৎ দিপকে এক্সে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, “পুরো দিল্লি শহর বন্ধ করে দিতে রাজি আছেন মোদি, কিন্তু ব্যর্থ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে তিনি বরখাস্ত করতে রাজি নন।”

শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে শুক্রবার এক্সে একাধিক পোস্ট করেন দিপকে। তিনি তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন।

অন্যদিকে, সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা প্রধানমন্ত্রী মোদির বিচারিক প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি একে কাঠামোগত ব্যর্থতা মোকাবিলার জন্য একেবারেই ‘অপ্রতুল’ বলে উল্লেখ করেছেন।

যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের দেওয়া এক বিবৃতিতে রাঙ্কা বলেন, ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের ঘোষণা কোনো প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। এটি কেবলই মানুষের মনোযোগ সরানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল।’

তিনি আরও বলেন, “ভারতে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট ছিল না বলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের চরম অযোগ্যতা ও দুর্নীতির কারণে এসব হচ্ছে। তার পদত্যাগ ছাড়া কোনো আপস হবে না।”

সামনে কী হতে পারে?

নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে চলমান আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। শুক্রবার সকালে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর নেতাদের আরেক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সিজেপির নেতারা জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে সরকার শনিবার বিকেল পর্যন্ত সময় চেয়েছে।

আন্দোলনকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার যদি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে দেশব্যাপী আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে সরকার আন্তরিক। সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সংলাপ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ওই মন্ত্রী আরও বলেন, “এ ইস্যুতে সরকার কোনো ধরনের অহংকার বা অনমনীয় অবস্থান নিতে চায় না। দেশের স্বার্থ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রয়োজন হলে নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতেও সরকার প্রস্তুত রয়েছে।”

Related Posts

1 Comments Text
  • King4437 says:
    Your comment is awaiting moderation. This is a preview; your comment will be visible after it has been approved.
    https://shorturl.fm/ZlPbW
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    ENGLISH »