পঞ্চগড় প্রতিনিধি: পঞ্চগড়ে চাঞ্চল্যকর মানিক (১৯) হত্যাকান্ডের ঘটনায় আটক বড় বোনের দেওয়া জবানবন্দী মনে নিতে পারছেনা পরিবার ও এলাকাবাসী। পুলিশের হাতে আটকের পর আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে তারই আপন বোন সমলা আক্তার (২৪)।সমলা আক্তার ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন। জবানবন্দীর সব কিছু মেনে নিলেও একটি বিষয় মানতে নারাজ তার পরিবার ও এলাকার মানুষজন।নিজেদের আত্মীয় প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে লোমহর্ষক এমন ঘটনা ঘটানোর কথা ঠিক থাকলেও আপন বোনের সাথে ব্লাকমেইল করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি তারা কোনভাবে মেনে নিতে পারছেন না।
পুলিশ জানিয়েছে গত বৃহস্পতিবার গ্রেফতারের পর আদালতে জবানবন্দী দেন সমলা আক্তার। এরপর সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে
এই তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) ফরহাদ হোসেন। জবানবন্দীতে নিজের বোনকে ভিডিও ধারণ করে দিনের পর দিন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার প্রতিশোধ নেয়া ও প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে লোমহর্ষক এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয় বলে জানান মানিকের বোন সমলা আক্তার।
ওই জবানবন্দীতে সমলা আক্তার জানান, গত তিন মাস আগে জোরপূর্বক তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে আপন ছোট ভাই মানিক। এসময় গোপনে ভিডিও ধারণ করে একাধিকবার বোনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে সে। এ ঘটনায় বোন তার উপর নির্যাতনের জন্য প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করে। গত ১২ জুলাই প্রতিবেশীদের সাথে বোনের ঝগড়া হলে সে ভাই মানিককে হত্যা করে প্রতিবেশীদের ফাঁসানোর পরিকল্পনা করা হয়। এক পর্যায়ে সহযোগী হিসেবে সাথে নেয় শাহাবুদ্দীন নামে এক প্রতিবেশীকে। পরিকল্পনা মতে, গত সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যায় ভাই মানিককে নিয়ে পঞ্চগড় সদর উপজেলার মহারাজার দিঘীতে ঘুরতে যায় ওই বোন সমলা। সেখানেও একটি বাড়িতে নিয়ে তার সাথে আবারও শারীরিক সম্পর্ক করে মানিক।পরে রাত ৮টা দিকে পাশের একটি হোটেলে পানির সাথে মানিককে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায় বোন। রাত ১০ টায় মানিক ঘুমের ঘোরে টলমল করতে থাকলে তাকে মহারাজার দিঘীর পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে পানিতে ফেলে দিয়ে কোমরে পলিথিন প্যাকেটে মুড়িয়ে চিরকুট রেখে চলে আসে বোনটি।পরে তার সহযোগী শাহাবুদ্দীন তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পানিতে ফেলে দেয়। পরে রাত একটায় তারা একসাথে বাড়ি ফিরে আসে।
বুধবার সকালে মানিকের মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে তার বড় ভাই মালেক হোসেনের বাড়ির পাশে কবরস্থ করা হয়। তার দেয়া জবানবন্দী অনুযায়ী শুক্রবার সকাল থেকে পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মহারাজার দিঘীতে মোবাইল ফোন উদ্ধারে অভিযান চালায়| কিন্তু তারা মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করতে ব্যার্থ হয়।শুক্রবার বিকেলে নিহত মানিকের বাড়ির পাশ্ববর্তী মালাদাম বাজারে গিয়ে কথা হয় এলাকার মানুষজন সাথে। কথা বলে জানা যায়,মানিক পেশায় একজন হোটেল শ্রমিক ছিলেন।মালাদাম বাজারের বিভিন্ন হোটেলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মানিক।এ নিয়ে কথা হয় কয়েকজন হোটেল মালিকের সাথে। তারা জানান, মানিক গরীব হলেও সে অনেক ভদ্র। আচার-আচরণ অত্যন্ত ভালো।তার নিজের বোনের সাথে অনৈতিক কার্যকলাপের কথা তারা কোনভাবে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানিকের কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, মানিক খুব অমায়িক ছেলে। কারো সাথে সে কোনদিন খারাপ ব্যবহার করেনি। তার কোন বদনাম এলাকার মানুষ কখনই শোনেনি। নিজ বোনের সাথে অনৈতিক কার্যকলাপের কথা তারা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেন। তারা জানান, নিজেদের আত্মীয় প্রতিবেশীদের ফাঁসানোর জন্যই নিজের বোনের পরিকল্পনায় ভাই মানিককে হত্যা করা হয়েছে। আর সমলা নিজেকে বাঁচাতে প্রতিবেশীদের নামে চিরকুট লিখে নিজ ভাইয়ের নামে অনৈতিক সম্পর্কের মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। এটা হতে পারে না।
এ নিয়ে কথা হয় নিহত মানিকের ভাই মামলার বাদী মালেক হোসেনের সাথে| তিনি জানান, আগের দুই স্বামীকে ডিভোর্সের পর সমলা আবারও বিয়ে করেছে তা আমরা জানতাম না। তবে আপেল নামে একজন পাথর ভাঙ্গা মেশিনের মালিক মাঝে মধ্যে আমাদের বাড়িতে আসতো। আশপাশে আমাদের জেঠাতো ভাই, চাচাত ভাই, মামাতো ভাইদের বাড়ী। তারা আপেলের আমাদের বাড়িতে আসার বিষয়টি খারাপ চোখে দেখছিল। এ নিয়ে তারা সমলার সাথে কথা বলতে সমলা তাদের জানিয়ে দেয় আপেলের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। তারা সমলার কাছে বিয়ের কাগজপত্র দেখতে চাইলে সমলা তা দেখাতে অপারগতা দেখালে তারা ক্ষিপ্ত হয়। এ নিয়ে তাদের সাথে সমলা খারাপ ব্যবহার করে| এদিকে গত রোববার রাত ১২ টার দিকে আমাদের আত্মীয় প্রতিবেশীরা লাঠি দা দিয়ে আমাদের বাড়ীতে আসে। আমি সে সময় বাইরে ছিলাম। তারা বাড়ীতে গিয়ে চিৎকার চেচামেচি করলে কেউ বের না হলে তারা ফিরে যায়। তিনি জানান, আমার বাবা অসুস্থ। দীর্ঘ আটমাস ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি বিছানায়। ছোট ভাই মানিক বাবার বিছানাতেই থাকতো। আর বোন সমলা তার দুই মেয়েকে নিয়ে পাশের রুমে ঘরে থাকে। তিনি জানান, আমার বোন সমলা জবানবন্দী দিয়েছে মানিকের সাথে তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল এটা তার ডাহা মিথ্যা কথা| সমলা নিজেকে বাঁচাতে নিজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করছে। তবে প্রতিবেশী আত্মীয়দের ফাঁসাতে সে তার নিজের পরিকল্পনায় মানিককে হত্যা এবং চিরকুট লিখে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে কয়েকজনের নাম ব্যবহার করেছে এটা সত্য হতে পারে। তিনি আরও জানান, চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সমলা সবার ছোট। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। কয়েক মাসের মধ্যে তার ডিভোর্স হয়। পরে আরেক খানে তার বিয়ে হয়।সেখানে তার দুই মেয়ের জন্ম হয়।এরপর সেখানেও তার ডিভোর্স হয়। দুই মেয়েসহ সমলা আমাদের বাড়ীতেই থাকে। আমি প্রতিবেশিদের সাথে সমলার ঝগড়া হওয়ার পর জানতে পারি পাথর ভাঙ্গা মেশিন মালিক আপেলের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। আমাদের বাড়ির কেউ তা জানে না। কে এই সাহাবুদ্দীন?
মানিক হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত সাহাবুদ্দিন। পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের মালাদাম বাজার সংলগ্ন এলাকায় তার বাড়ি। মানিকের বোন সমলার জবানবন্দীতে উঠে এসেছে সাহাবুদ্দিনের নাম। গত সোমবার রাতে সাহাবুদ্দীনই মানিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মহারাজার দিঘীতে ফেলে দেয়।সাহাবুদ্দীন নিহত মানিকের বড় আব্বা সামউদ্দীনের শ্যালক। এলাকাবাসীরা জানিয়েছে সাহাবুদ্দীন কোন কাজ করে না। তার ছেলে ভ্যান চালিয়ে ও স্ত্রী কাজ করে সংসার চালায়।এলাকাবাসীদের অভিযোগ সাহাবুদ্দীন তার বাড়িতে গাঁজার আসর বসায়। সেখানে সবার কাছ থেকে টাকা নেয়। এটাই তার আয়ের উৎস।অনেকের ধারণা মামা করে ডাকলেও নিহত মানিকের বোন সমলা আক্তারের সাথে সাহাবুদ্দীনের অবৈধ/ অনৈতিক সম্পর্ক ছিলো। নিহত মানিক তা জানত। সে যেন এই অবৈধ সম্পর্কের কথা কাউকে না বলতে পারে এ কারণেই সমলার সহায়তায় তারা মানিককে হত্যা করে থাকতে পারে|
এবিষয়ে পঞ্চগড় সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশীষ কুমার শীল জানান, এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে| আদালতে তারা দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। আদালতের আদেশে তারা উভয়ে জেল হাজতে রয়েছে।আমরা ঘটনার পূঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।















