ঐতিহ্যবাহী ঔষধিগুণসম্পন্ন চাগুয়া গাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ কৃষি বিভাগের কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে কাউনিয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও ঔষধিগুণসম্পন্ন চাগুয়া গাছ (চাউ সুপারি) দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এই পামজাতীয় গাছের দেখা মিললেও বর্তমানে তা বিলুপ্তির পথে। পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রæত সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চাগুয়া গাছ শুধু ইতিহাস হয়েই থাকবে।
দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই গাছ মানুষের উপকারে এসেছে। অথচ আধুনিকতার ছোঁয়া, বাণিজ্যিক বনায়নের প্রসার, দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণে উদাসীনতার কারণে গ্রামবাংলার অনেক উপকারী গাছের মতো চাগুয়াও হারিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেসব বাঁশঝাড়, বাড়ির আঙিনা কিংবা গ্রামীণ পরিবেশে চাগুয়া গাছ স্বাভাবিকভাবে জন্মাতো, এখন সেখানে এ গাছের উপস্থিতি খুবই কম। তাল ও খেজুর গাছের মতো লম্বা এবং শক্তিশালী শিকড়বিশিষ্ট হওয়ায় চাগুয়া গাছ প্রকৃতির ‘আর্থিং’ হিসেবে কাজ করে বলে স্থানীয়দের ধারণা। এছাড়া বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ও লোকজ চিকিৎসায়ও এ গাছের ব্যবহার রয়েছে।
সহকারী অধ্যাপক আঃ কুদ্দুছ বলেন, “যে বৃক্ষ মানবসভ্যতার কল্যাণে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়, সেই বৃক্ষই আজ মানুষের অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংরক্ষণের অভাবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ চাগুয়া গাছ এখন বিপন্ন।”
বেইলীব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আলহাজ আঃ হক জানান, “একসময় প্রতিটি গৃহস্থ বাড়ির বাঁশঝাড়ে তিন-চারটি চাগুয়া গাছ দেখা যেত। তখন তাল, খেজুর ও চাগুয়া গাছ বেশি থাকায় বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতিও তুলনামূলক কম ছিল। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এসব গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে।”
শিক্ষক রমজান আলী বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চাগুয়া গাছ চিনে না। বন্যা, খরা, ঝড় কিংবা বয়সজনিত কারণে গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন করে রোপণ ও সংরক্ষণে কৃষি বিভাগ কিংবা প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। নার্সারিগুলোতে বাণিজ্যিক গাছের চারা সহজে পাওয়া গেলেও চাগুয়া, তাল ও খেজুর গাছ সংরক্ষণে কেউ আগ্রহী নয়।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার বলেন, “চাগুয়া গাছ থেকে সরাসরি আর্থিক লাভ কম হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও কম। ফলে এ গাছের বিস্তার ঘটছে না।”
পরিবেশবিদদের মতে, সবুজ বনায়নের নামে শুধু বাণিজ্যিক গাছ রোপণ নয়, দেশীয় ও ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চাগুয়া গাছ রোপণ ও সংরক্ষণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।













