আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) তাদের এক প্রতিবেদনে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং বড় ধরনের সহিংসতা বা অনিয়ম ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আইসিজি জানায়, নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন জনমানুষের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সামাল দেয়া তাদের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইসিজির বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন বলেন, “নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি ইতিবাচক দিক। তবে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব থেকে দেশকে সুরক্ষা দেয়া।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। ফলে ওই অঞ্চলের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যাহত হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
আইসিজি সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং নতুন করে দারিদ্র্য বাড়াতে পারে।
এছাড়া সংস্থাটি মনে করে, সরকার যদি জনসমর্থন ধরে রাখতে চায়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার পরামর্শও দেয়া হয়েছে।
আইসিজির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ২০০৮ সালের পর এই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এটি অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। পূর্ববর্তী কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও এবারের নির্বাচনে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে তারা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে কাজ করেছে, যদিও প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল।
সবশেষে আইসিজি উল্লেখ করে, সাম্প্রতিক গণভোটে সংস্কারপন্থীদের সমর্থন পাওয়া গেছে। সংবিধান সংশোধন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরশাসন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে এসব সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।



