এফডিসি এখন ছাগলের খোঁয়াড়ে পরিণত হয়েছে: অভিনেতা উজ্জ্বল

0
15

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএফডিসি) বলা হয় চলচ্চিত্রের আঁতুড়ঘর। একটা সময় এফডিসি’র প্রতিটি ফ্লোর চলচ্চিত্র শিল্পী ও নির্মাতাদের পদচারণায় ছিল মুখর। কিন্তু সেই বিএফডিসি এখন নানা অব্যবস্থাপনায় জড়সড়। জৌলুস আগেই হারিয়েছে সংস্থাটি। সিনেমার কাজ এখানে হয় হাতেগোনা। বেশির ভাগ সিনেমার শুটিং হয় এফডিসি’র বাইরে। সবমিলিয়ে ঋণের জালেও আটকা এ প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানটির সমস্যা, কর্ম পরিকল্পনা ও সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেছেন এক সময়ের ঢাকাই ছবির কিংবদন্তি অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল।

শুরুর দিকের এফডিসি: এফডিসি’র শুরুর কথা বলতে গিয়ে মেগাস্টার উজ্জ্বল বললেন, ১৯৫৭ সালে এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় যারা চলচ্চিত্রের কাজ করেছেন তারা অত্যন্ত নিবেদিত, সৃজনশীল ছিলেন। সে সময় বাইরের ছবি আমদানি করা হতো। তবে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ ও হলে প্রদর্শনের পর দর্শক তা লুফে নেয়। আর স্বাধীনতার পর তো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বুম করে। সে সময় কারও ট্রেনিং ছিল না। সবাই ছিলেন স্ব-শিক্ষিত। নব্বই দশক পর্যন্ত এফডিসি ছিল চলচ্চিত্রের প্রাণ। প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে ছিল চলচ্চিত্রের মূল কার্যক্রম।

শুটিং নেই এফডিসিতে: উজ্জ্বল বলেন, এফডিসিতে যখন আমরা যাই তখন ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। এফডিসিতে সব আছে, কিন্তু ব্যবহারকারী নেই। নতুন সিনেমা হচ্ছে, নায়ক-নায়িকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পরিচালক-প্রযোজকরাও আসছেন। কিন্তু কেউ এফডিসিমুখী হচ্ছেন না। এখানে কাজ করতে আগ্রহী নন এখনকার শিল্পী-পরিচালক-প্রযোজকরা। উজ্জ্বল মনে করেন, এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিগত দেড় যুগ অনিয়ন্ত্রিত ছিল চলচ্চিত্র। কোনো সিস্টেম ছিল না। সরকার কর্তৃক নিয়োজিত প্রশাসন এফডিসিকে সচল রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এফডিসি এনালগ ছিল। প্রযুক্তির প্রভাবে ডিজিটালি পরিবর্তনটা এখানে ঠিকঠাকভাবে হয়নি। এখন সময় বদলের সঙ্গে সিনেপ্লেক্সের প্রবর্তন হয়েছে। ছবির সংখ্যা ও হলের সংখ্যা কমেছে। ফলে সিনেমার ব্যবসা অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এফডিসি এখন ছাগলের খোঁয়াড়ে পরিণত হয়েছে। এর সব কাজ হচ্ছে বাইরে। এখান থেকে বের হতে হলে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

উত্তরণের উপায়: এফসিডি’র সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহার প্রয়োজন বলে মনে করেন উজ্জ্বল। তিনি বলেন, সরকার যদি চায় সিনেমা শিল্পকে সচল করতে সেক্ষেত্রে এফডিসি ব্যবহারকারী অর্থাৎ শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকদের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। সময় উপযোগী কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে মার্কেটিংটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পকলাসহ দেশে সরকারি যে অডিটোরিয়ামগুলো রয়েছে, সেগুলোতে সিনেপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। সিনেমা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে ব্যবহারকারীরা আরও বেশি আগ্রহী হবে এফডিসি’র প্রতি। পাশাপাশি আয়ের উৎস যোগ হবে। পাশাপাশি এফডিসিকে ব্যবহার উপযোগী করতে হলে লাগবে দক্ষ ব্যবহারকারী। এক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দিতে হবে, ট্রেনিং দিয়ে তাদের কাজে লাগাতে হবে; এফডিসি’র ফটোগ্রাফি, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, এডিটিংসহ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে। দক্ষ লোকের অভাবে এখানে কাজ করছে না কেউ। সবাই টেকনিক্যাল কাজগুলো বাইরে গিয়ে করছেন। দক্ষ তরুণ জনবল এখানে কাজ করলে টেকনিক্যাল সাইড শক্ত হবে। যারা সিনেমা বানাচ্ছেন তারা অবশ্যই আসবেন। পাাশাপাশি যারা এখানে কাজ করবেন তাদের প্রমোট করতে হবে। এর বাইরে গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, গবেষক, সাংবাদিকদের নিয়ে একটি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেল তৈরি করতে হবে। নিত্য নতুন বিষয় নিয়ে গবেষণা হবে এখানে। সংলাপ ও চিত্রনাট্যের কাজ হবে। মোট কথা, এফডিসি থেকে যেন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সব সেবা এখান থেকেই নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

নিজের ভাবনা: আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয় থেকে শুরু করে প্রযোজনা, পরিচালনা ও বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছি এই পথচলা অনেক কষ্ট, ব্যর্থতা, সফলতা পথপরিক্রমায়। বিনিময়ে গ্রহণযোগ্য ইমেজের অধিকারী, ঠিক একইভাবে যারা রাজনীতি করেন তাদের জীবন আরও কঠিন, ভয়াবহ। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, জেল, জুলুম, প্রিজন ভ্যান, আদালতের কাঠগড়া, পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে তারা আদর্শিক লড়াইয়ে নিবেদিত। নির্বাচন এলেই রাজনীতির বাইরের পরিচিত মুখরা যখন আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে এমপি, মন্ত্রী হওয়ার লাড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, সেটা দুঃখজনক। দেশ ও জাতির উন্নয়নে রাজনীতিবিদদেরই সক্রিয়া হওয়াটা স্বাভাবিক। আমরা যারা বিভিন্ন পেশায় আছি তারা

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহায়ক শক্তি হলে শোভনীয় মনে করি। বর্তমান সরকারের সঙ্গে যেহেতু সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আছি, সেহেতু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে আমার যে চিন্তা চেতনা, চলচ্চিত্রে যারা আছেন তাদের নিয়ে ডিজিটাল চলচ্চিত্র গড়ার লক্ষ্যে সবাই মিলে সরকারের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি ও ক্রীড়াবান্ধব। এর আগে শহীদ প্রেডিডেন্ট জিয়াউর রহমান চলচ্চিত্রের গুণীজনকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আশা করি, সংকটাপন্ন সোনালি দিনের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে ডিজিটাল যুগের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY