• Home
  • দেশ
  • কাউনিয়ায় তিস্তার বালুচরে বাদামের সবুজ বিপ্লব, ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন কৃষকের
Image

কাউনিয়ায় তিস্তার বালুচরে বাদামের সবুজ বিপ্লব, ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন কৃষকের

বাম্পার ফলনের আশায়

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ দু’দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিস্তার চরাঞ্চলের কৃষকেরা এবার বীজবাদাম চাষ করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। নদীর পানি নেমে জেগে ওঠা বালুচর এখন সবুজ বাদামগাছে ছেয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষিরা। ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পেলে বন্যার ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা।

সরেজমিনে তিস্তা নদীর চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পানি কমে যাওয়ায় ছোট-বড় অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। এসব চরের ধু-ধু বালুচরে সারি সারি বীজবাদামের গাছ বেড়ে উঠছে। রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা নদীবেষ্টিত ২২টি চরে এবার বীজবাদামের আবাদ করেছেন কৃষকেরা। খেতজুড়ে সবুজের সমারোহ দেখে তাঁদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আশার আলো। কম খরচে ভালো ফলন ও বাজারে আকর্ষণীয় দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন বুনছেন তাঁরা।

অসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তিস্তা নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় প্রতিবছরই চরাঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আসছে। প্রতিবছর বন্যায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জেগে ওঠা চরে বীজবাদাম, কাউনসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছেন কৃষকেরা। এসব ফসল চরাঞ্চলের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

ঢুসমারা চরের কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, বীজবাদামের খেত থেকে আগাছা তুলে গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অন্য অনেক ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে সার ও কীটনাশকের প্রয়োজনও কম হয়। রোপণের আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যেই বাদাম তোলা যায়। এরপর তা সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি করা সম্ভব। ফলে অল্প সময়ে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে।

নিজপাড়া গ্রামের বাদামচাষি স্বাধীন বলেন, তিনি ২৫ শতক জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। খেতের বর্তমান অবস্থা ভালো থাকায় তিনি প্রায় ছয় মণ বাদাম পাওয়ার আশা করছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদিত বাদাম বিক্রি করে ৪৫ থেকে ৪৮ হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে।

তবে বাদাম চাষে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান তিনি। স্বাধীন বলেন, পাতা মোড়ানো পোকা ও বিছা পোকা বাদামগাছের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। এ ছাড়া চরের জমিতে ইঁদুর মাটির নিচে থাকা বাদাম খেয়ে ফেলে। সঠিক সময়ে বালাই দমন এবং ফাঁদ বা বিষটোপ ব্যবহার করে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

তালুকশাহবাজ গ্রামের কৃষক তোতা বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় বীজবাদাম চাষে খরচ কম এবং বাজারদর ভালো থাকায় এবার তাঁরা বেশি জমিতে বাদামের আবাদ করেছেন। ফলন ভালো হলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন বলে তিনি আশা করছেন।

চর গনাই গ্রামের কৃষক দুদু মিয়া বলেন, আলু চাষে লোকসান হওয়ায় তা পুষিয়ে নিতে এবার কয়েক বিঘা জমিতে বীজবাদাম চাষ করেছেন। তাঁর মতে, অন্যান্য ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি। তাই ভালো ফলনের আশায় তিনি এ ফসলের আবাদ বাড়িয়েছেন।

তবে কৃষকদের দুর্দশা লাঘবে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান দুদু মিয়া। তিনি বলেন, কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁদের খোঁজখবর নেওয়ার লোক কম। চরাঞ্চলের কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়াতে হবে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, তিস্তার চরাঞ্চলের পলিমাটি ও বেলেমাটি বাদাম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ কারণে তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে উৎপাদন খরচ কম এবং বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকেরা লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন জানান, তিস্তার চরাঞ্চলে বীজবাদাম চাষ করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে কাউনিয়া উপজেলার ২২টি চরে বীজবাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২০ মেট্রিক টন।

স্থানীয়দের মতে, তিস্তার চরাঞ্চলে বীজবাদামের আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বীজবাদাম চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। তবে এ সম্ভাবনাকে টেকসই করতে কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও নিয়মিত পরামর্শসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »