• Home
  • দেশ
  • কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেতে পাখির ‘প্রাকৃতিক কীটনাশক’
Image

কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেতে পাখির ‘প্রাকৃতিক কীটনাশক’

পার্চিং পদ্ধতিতে মাজরা, পাতা মোড়ানোসহ ক্ষতিকর পোকা দমন করছেন কৃষকরা

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ রংপুরের কাউনিয়ায় আমন ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের আইল বা জমির মাঝে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি স্থাপন করে পোকাখেকো পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। এসব পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে।

উপজেলার কৃষকরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। ডেড পার্চিংয়ে জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি বা খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয়। আর লাইভ পার্চিংয়ে জমিতে ধইঞ্চা বা অন্য কোনো জীবিত গাছ লাগিয়ে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের রোপণ করা আমন ধানের ক্ষেত এখন সবুজে ছেয়ে গেছে। কোথাও ধানে শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের মাঠের মাঝে দেখা যাচ্ছে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে।

কৃষকরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে। একই সঙ্গে পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক জৈব সার হিসেবে যোগ হয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করছে। নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, “পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। তাই আমরা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছি।” গদাই গ্রামের ধানচাষি শাহজাহান মন্ডল বলেন, “এবার আমাদের জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। পুরো ক্ষেতেই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। আর কিছুদিন পরই আশা করছি সোনালি ধান ঘরে তুলতে পারব।”

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্চিং পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেক কৃষক আমন ধানক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার না করে পোকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি গ্রহণ করছেন।

কৃষি বিভাগ জানায়, আমন ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা ও লেদা পোকার মথ। পার্চিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকা ও কীড়া ধরে খেয়ে ফেলে। ফলে পোকামাকড় ডিম পাড়ার আগেই অনেকাংশে ধ্বংস হয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই তাদের বংশবিস্তার কমে যায়।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউনিয়ায় পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক কেনার খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকের লাভও বাড়ছে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা এই প্রাকৃতিক ও লাভজনক পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। ধানের চারা রোপণের ২০ দিনের মধ্যে জমিতে পার্চিং স্থাপন করা প্রয়োজন। পোকার আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই এটি করা জরুরি। তিনি আরও জানান, প্রতি বিঘা (৩৩ শতক) আমন জমিতে অন্তত ৫ থেকে ৬টি গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি পুঁত দিতে হয়। এগুলোর উচ্চতা ধানগাছের সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে কমপক্ষে এক ফুট বেশি হওয়া দরকার। এতে পাখিরা সহজে বসতে পারে এবং পুরো ক্ষেতের ওপর নজর রাখতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ সালাহউদ্দিন জানান, চলতি আমন মৌসুমে কাউনিয়ায় ১১ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, “চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমন ধানের মাঠের চিত্র বেশ ভালো। এতে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষক এবার পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন পরামর্শের মাধ্যমে পার্চিং পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে আগের তুলনায় বেশি জমিতে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।” কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কম খরচে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা দমন, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »