মুন্সীগঞ্জের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সাবেক প্যানেল স্পিকার, পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আব্দুল হাই (৮০) মারা গেছেন।
বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকায় নিজ বাসায় ৮০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মরহুমের নামাজে জানাজা বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মরদেহ মুন্সিগঞ্জে নেওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
তার মৃত্যুতে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। অটল নীতি, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সাদামাটা জীবনযাপন ও সহজ বাচনভঙ্গির কারণে দলমত-নির্বিশেষে এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আবদুল হাইয়ের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে মুন্সীগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে।
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হাই। তার বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তার স্ত্রী জামিলা খাতুন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তার বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আব্দুল হাই মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রাখেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হাই। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে তার দীর্ঘ পথচলা তাকে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয়। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ১২ জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। তিনি তৎকালীন মুন্সীগঞ্জ-৪ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিভিন্ন সময়ে ঢাকা-৮ ও মুন্সীগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পরে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে প্যানেল স্পিকার নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য ও উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকার— আব্দুল হাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা মুন্সীগঞ্জের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তার মৃত্যুতে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন প্রবীণ নেতার অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তার প্রয়াণে রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।














