আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের তৈরিকৃত অননুমোদিত কিছু বসতি বা আউটপোস্ট ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই নেতানিয়াহু এই নির্দেশ দিয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই নির্দেশ তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা ইসরায়েলি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই এসব আউটপোস্ট তৈরি করেছে। সাধারণত এসব আউটপোস্টে আগে থেকে তৈরি করা ছোট ছোট কারাভান বা মোবাইল ঘর থাকে এবং সেখানে অল্পসংখ্যক বসতিস্থাপনকারী বসবাস করেন।
ইসরায়েলি রাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে। আবার কিছু আউটপোস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। স্বীকৃতি পাওয়ার পর সেগুলো সরকারি অর্থায়নের সুযোগ পায়। তবে এসব আউটপোস্ট উচ্ছেদের অভিযান কবে শুরু হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।
বসতি স্থাপনকারীদের তাড়ানো তিন ফিলিস্তিনি পরিবারকে ফেরানোর ব্যাপারে গতকাল রোববার ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, পশ্চিম তীরের জালুদ গ্রামের তিন ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের বাড়িতে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে। বসতি স্থাপনকারীরা ওই পরিবারগুলোকে তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশ্বের অধিকাংশ সরকার মনে করে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ। তারা পশ্চিম তীরকে সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন অধিকৃত ভূখণ্ড হিসেবেও বিবেচনা করে। তবে ইসরায়েলের দাবি, পশ্চিম তীর অধিকৃত নয়, বরং এটি একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু অননুমোদিত এসব আউটপোস্ট উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। শনিবার ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সহিংসতায় জড়িত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নিন্দা করেন। পশ্চিম তীরের একটি ফিলিস্তিনি শহরে কয়েকজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকানের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে ইসরায়েলি ওয়েবসাইট ওয়াইনেট জানিয়েছিল, নেতানিয়াহুর নির্দেশের আওতায় অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রায় ১০০টি আউটপোস্ট রয়েছে। পশ্চিম তীরে যেকোনো আউটপোস্ট উচ্ছেদের কাজে সাধারণত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সামরিক বাহিনী যুক্ত থাকে। তবে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে করা অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
জেরুজালেমে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচকে ওয়াইনেটের প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ‘এরিয়া এ এবং বি’তে তৈরি করা স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। পশ্চিম তীরের যেসব এলাকায় অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন, সেগুলোর বড় অংশ এরিয়া এ ও বি-এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি অসলো অ্যাকর্ডসের অধীনে পশ্চিম তীরকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো এরিয়া এ, বি এবং সি।
স্মতরিচ নিজেও একজন দখলদার বসতিস্থাপনকারী। তিনি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণের আবাসন প্রকল্প তদারকি করেছেন এবং অবৈধভাবে নির্মিত কিছু বাড়িকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দিয়েছেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এরিয়া সিতে বসতি সম্প্রসারণে এগিয়ে যেতে সরকার বড় ধরনের অগ্রগতি করেছে।
পশ্চিম তীরে শত শত অননুমোদিত আউটপোস্ট
ইসরায়েলি সংগঠন পিস নাও-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে বর্তমানে ৩৪০টি আউটপোস্ট রয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এমন বসতির সংখ্যা ১৪৬টি। পিস নাও বসতি সম্প্রসারণের সমালোচনা করে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান করে।
গত মাসে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা কাছের একটি গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ঘেরাও করে রাখে। ওই বাড়িগুলোর একটি ছিল একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকানের মালিকানাধীন। পরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বসতি স্থাপনকারীদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়। তবে গ্রামের ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এরপরও তারা ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
ইসরায়েলি সরকার বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার নিন্দা করেছে। তবে এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুব কম ক্ষেত্রেই গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের আরও কম সংখ্যককে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। শনিবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, সহিংসতায় জড়িত বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ইসরায়েলের নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন।
তিনি এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অপরাধমূলক আচরণ ও সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।





















