মৎস্য বিভাগ নিরব দর্শক
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ একসময় গ্রামবাংলার খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও নিচু জমিতে পানি কমে গেলে কাদা-পানিতে মাছ ধরার উৎসব ছিল বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও দল বেঁধে নেমে পড়তেন মাছ ধরতে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। মৎস্য বিভাগের উদাসিনতায় দেশীয় মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় আগের মতো জমে ওঠে না মাছ ধরার সেই উৎসব।
বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পানিতে তিস্তা নদীসহ কাউনিয়ার বিভিন্ন খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও নিচুজমি পানিতে ভরে ওঠে। এ সময় এসব জলাশয় ও ডুবে থাকা জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের বিচরণ বাড়ে। বর্ষা শেষে পানি কমতে শুরু করলে জলাশয়ের বিভিন্ন স্থানে মাছ আটকা পড়ে। তখন সামান্য পানি সেচে কিংবা কাদা-পানিতে হাত ঢুকিয়ে মাছ ধরার আয়োজন শুরু হয়।
রংপুরের নদীবেষ্টিত কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা, মানাস ও বুড়াল নদীসহ রয়েছে বেশ কিছু খাল-বিল ও জলাশয়। এসব জলাশয়ে একসময় প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের প্রাচুর্য অনেকটাই কমেছে। শোল, টাকি, পুঁটি, খলসে, কৈ, মাগুর, শিং ও ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখন আগের তুলনায় কমই দেখা যায়।
সম্প্রতি উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের হরিশ^ও গ্রামে কাদা-পানিতে মাছ ধরার এমনই এক দৃশ্য দেখা গেছে। শিশু-কিশোরসহ স্থানীয়রা দলবেঁধে কাদায় নেমে মাছ ধরছিল। কেউ হাত দিয়ে কাদা ঘেঁটে মাছ খুঁজছিল, আবার কেউ ছোট পাত্রে করে মাছ সংগ্রহ করছিল। এ সময় তাদের মধ্যে ছিল আনন্দ উৎসবের আমেজ।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর পানি কমে গেলে এলাকার পুকুর, ডোবা-নালা ও নিচু জমিতে এভাবে মাছ ধরার আয়োজন হয়। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও বয়স্কসব বয়সী মানুষই এতে অংশ নেন। তবে আগের মতো এখন আর দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। ফলে মাছ ধরার উৎসবও দিন দিন ম্লান হয়ে আসছে।
তাদের মতে, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, জলাশয় ভরাট, মাছের প্রজননক্ষেত্র কমে যাওয়া এবং নদী-খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশীয় মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। এতে শুধু মাছের প্রাচুর্যই কমেনি, হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাদাজলে মাছ ধরার আনন্দও।
বালাপাড়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, “আগে বর্ষা শেষে এবং প্রখর রোদে যখন খাল-বিল ও নিচু জমিতে পানি কমে যায় তখন কাদাপানি থেকে মাছ ধরে মানুষ বাড়ি ফিরত। সেই দুশ্য ছিল খুবই আনন্দের। এখন আগের মতো মাছও নেই, সেই উৎসবের আমেজও আর তেমন দেখা যায় না।”
স্থানীয়দের দাবি, ঘটাকরে মৎস্য সপ্তাহ পালন করা হয় কিন্তু দেশী মাছ রক্ষায় মৎস্য দপ্তরের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। কাউনিয়ায় দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষা এবং কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যও কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


















