চিকিৎসকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলেও তা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, চিকিৎসকদের মূল দায়িত্ব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। সেবার মানসিকতা ও পেশাগত নিষ্ঠা ছাড়া শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার পর তিনি চিকিৎসক সমাবেশের উদ্বোধন করেন। এ সময় জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে জাতীয় সংগীত ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। সমাবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী শান্তির প্রতীক হিসেবে দুটি পায়রা উড়িয়ে দেন।
স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও জনবান্ধব করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানান তারেক রহমান। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অর্থের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে সরকারি ও বেসরকারি সব চিকিৎসককে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে রোগ প্রতিরোধের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’। অর্থাৎ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের মধ্যে রোগের কারণ, প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে শুরু থেকেই সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী টমাস এডিসনের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু ওষুধ দেওয়া নয়, রোগীর শরীরের যত্ন, খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করাও চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, এ ধারণা এডিসনের বক্তব্যে পাওয়া যায়।
এই চিন্তার সঙ্গে সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মিল রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিয়ে সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে সহায়তা করবেন। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ চালুর কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো কিংবা নতুন অবকাঠামো তৈরি করলেই স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্বের প্রতি অনীহা বা পেশাগত শৈথিল্য থাকলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে ফেলে এবং চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল, মানবিক ও পেশাদার ভূমিকা প্রত্যাশা করে। রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং পেশাগত নিষ্ঠা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। শুধু একটি খাতে নয়, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে এই পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবিও রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো এবং রাজধানীর বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের এসব দাবি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের যে পরিস্থিতি পেয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তার ভাষায়, সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। সেই অবস্থা থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সরকার প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেছে। তবে শুধু বাজেট বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে চিকিৎসকদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। জনগণ যেন এ বরাদ্দের বাস্তব সুফল পায়, সে জন্য সরকার ও চিকিৎসক উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের মানুষ জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংক্রান্ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সরকার তা জানে।
তারেক রহমানের অভিযোগ, অতীতে জ্বালানি খাতে অপরিকল্পিত বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতি নেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট একটি মহলকে সুবিধা দিতে নেওয়া এসব সিদ্ধান্তের খেসারত এখন দেশ, দেশের মানুষ এবং বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্যাস, পেট্রোলসহ সামগ্রিক জ্বালানি খাতের অপরিকল্পিত পরিকল্পনাগুলো পুনর্বিবেচনা করে খাতটিকে সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে জ্বালানি সংকট থেকে দেশ ও মানুষকে বের করে আনার জন্য সরকার পরিকল্পনা করছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে আরও সক্ষম ও স্বনির্ভর করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংগঠনটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

















