গণঅভ্যুত্থান নিউটনের কোনো আপেল ছিল না, বরং এটি ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান কোনো নিউটনের আপেল ছিল না। এটাকে আমাদের পাকাতে হয়েছে, এটা কখনো অটোমেটিক ছিড়ে পড়েনি। দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে এই আপেলকে এই আন্দোলনকে, এই গণঅভ্যুত্থানকে আমাদের পেরে নিতে হয়েছে।’
শনিবার (৮ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা ও দ্বিতীয়বর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাদা দল’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রাজনীতির নতুন বন্ধুরা নতুন বন্দোবস্তের নতুন রাজনীতির কথা বলে পুরাতন বন্দোবস্তের ধারায়।
তাদেরকে সংশোধন হতে বলব। রাজনীতিতে বাল্যশিক্ষা শ্রেণির ছাত্র হয়ে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের মতো আচরণ করে, সেটা ঠিক নয়। শিখতে হবে, অনেক দূর যেতে হবে। রাজনীতির মাঠ অনেক কঠিন, বন্ধুর এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ। এতো সহজ নয়।’
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে, মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনের ভেতরে ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের কিছুই নেই, তাহলে এটাও রাজনৈতিক অপরিপক্কতা। সেজন্য বলি, রাজনীতির মাঠের প্রাইমারি স্কুলের বাল্যশ্রেণির ছাত্র হিসেবে যদি সবকিছু বুঝে নিয়েছি বলা হয়, আমি তাদেরকে বলবো, নতুন দলের নতুন বন্ধুদের, পুরাতন বন্দোবস্তের রাজনীতি বাংলাদেশে আর হবে না। চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে আর হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বন্ধুরা যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিল, কখনো কখনো তারা লুকিয়ে বা অন্যভাবে আন্দোলনে শরিক ছিল।
প্রকাশ্যে তারা খুব বেশি মাঠে-ময়দানে আন্দোলন করেনি। আমরা জাতীয় সংসদে বিতর্ক করবো, মাঠে-ময়দানে রাজনীতি করবো, সেটা হবে গণতান্ত্রিক চর্চা। কিন্তু আমরা এমন চর্চা করবো না, যাতে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন সহজ হয়।’
তিনি বলেন, ‘যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই কৃতিত্বকে ছিনতাই করতে চায়, যার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতি করতে চায়, তাদের কাছে আমরা অনেকবার বলেছি যে, চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে ফেইল করেছে (ব্যর্থ হয়েছে)। একাত্তরের চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে মারাত্মকভাবে ফেইল করেছে।’
দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যে বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন, এর দায় ভারত এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ভারতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দুটো বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ এবং দু’দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। বাংলা সংবাদ
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু ভারত যদি ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা করে, তাহলে দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী।
শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেয়ার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যদি বলা হয় যে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সমর্থন করে না, তাহলে বাংলাদেশ সেই বক্তব্য গ্রহণ করে।
তবে একই সঙ্গে একজন সাবেক স্বৈরশাসক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ভারতে বসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের আপত্তি রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকা একজন রাজনৈতিক নেতাকে ভারত কীভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নেতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিরুদ্ধে এবং দেশে অস্থিরতা তৈরির মতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার দায়িত্ব ভারত এড়িয়ে যেতে পারে না।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে বর্তমান গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির নেতারা দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে নির্বাসিত হয়েছেন, অন্যদিকে শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেয়ার প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অতীতে শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, ভারতকে বাংলাদেশ যা দিয়েছে, তা দেশটি চিরদিন মনে রাখবে। শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেয়ার ঘটনাকে সেই সম্পর্কের ‘পারস্পরিক প্রতিদান’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
আলোচনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব ও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনকে কেবল ৩৬ দিনের আন্দোলন হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে। ৫ আগস্টের অর্জন ১৭ বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ‘নিউটনের আপেল’ ছিল না যে নিজে থেকেই গাছ থেকে পড়ে গেছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এই গণঅভ্যুত্থানের পথ তৈরি হয়েছে। তাই শুধু ৩৬ দিনের আন্দোলনের ভিত্তিতে ১৭ বছরের আন্দোলনের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করা রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতার পরিচয়।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না; বরং জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল।
শেখ হাসিনা একাত্তরের চেতনা বিক্রি করতে করতে দিল্লিতে গিয়ে বসে আছে বলেও উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, দাফন হয়েছে দিল্লিতে এটা একটা প্রবাদ হয়ে গিয়েছে। প্রবক্তা আমি হলেও, প্রবাদ হতে তো অসুবিধা নেই। কেন হয়েছে? এই চেতনার রাজনীতি করতে করতে।’


















