ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জুলাইতে যারা আত্মাহুতি দিয়েছে সেসব পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করা। এটাই সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব। যারা আহত হয়েছে, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে, অঙ্গ হারিয়েছে, তাদেরকে সুস্থ করে তোলা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।’
আজ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আজ মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি গণতন্ত্র, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার সুতীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। ফ্যাসিবাদী সরকার বশংবদ পালাতে বাধ্য হয়। দেশ মুক্ত হয়, সূচিত হয় নতুন প্রভাত।
তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এলেম, তাইম, নাইমা, ছোট্ট শিশু রিয়া গোপ ও আহাদসহ অন্যান্য শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের আত্মদান ও দেশপ্রেম জাতিকে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে বলে উল্লেখ করেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি একজন মাকে তার অন্ধ ছেলেকে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখে অত্যন্ত অভিভূত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এই যুবক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চোখ হারিয়েছে। যদি তারা যথাযথ মর্যাদা না পান এবং সামান্য চাওয়া-পাওয়ার জন্যও মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে সেটি জাতির জন্য লজ্জার।
তিনি উপস্থিত জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা মন খারাপ করবেন না। এই সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়ই সম্মান আপনারা পাবেন। আমরা সেই সম্মান আপনাদেরকে দেব। আমাদের যতটুকু সাধ্য আছে সবকিছু উজাড় করে দেব আপনাদের কল্যাণের জন্যে।’
সকলের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এই নির্বাচিত সরকার ভুল করলে আপনারা শুধরে দেবেন।
অতীত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আর আওয়ামী লীগ হতে পারবো না, হতেও চাই না। আওয়ামী লীগকে দেখেন, তাদের কোনো অনুশোচনা নাই। এত অন্যায়-অবিচার, খুন, গুম, মানি লন্ডারিং, হত্যা, নির্যাতন, আয়নাঘর- এসবের জন্য তারা কোনো লজ্জাবোধ করে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক ফ্যাসিস্ট আবার বলে যে- ডিসেম্বর মাসে দেশে এসে পদার্পণ করবেন। আমরা অপেক্ষায় আছি। আসেন, দেশে আসেন, দেখা হবে ইনশাল্লাহ রাজপথে।’
নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে আরেকটা করবো, বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সুশাসন ও গণতন্ত্র চিরস্থায়ী করে যাব।’
তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র আছে, কিন্তু এমন নাগরিক খুব কম আছে যারা উদ্যত বন্দুকের সামনে আবু সাঈদের মতো দুই হাত তুলে দাঁড়াতে পারে। আমরা সেই জাতি। তাদেরকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন আমাদের জাতীয় লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।’
তিনি বলেন, ‘আজ আমরা একটি নতুন যাত্রার সূচনা পর্বে দাঁড়িয়ে আছি। এই যাত্রাপথ সহজ নয়। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।’
জনগণকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে কোনো বিভাজন, কোনো বিদ্বেষ বা কোনো সংকীর্ণ স্বার্থ আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে।
এসময় তিনি সবাইকে মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আসুন আমরা শহিদদের রক্তে অর্জিত এই নতুন সম্ভাবনাকে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করি।”
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ৭১-এর জনযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। একইভাবে জুলাইয়ের যুদ্ধও ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।’
বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমরা প্রত্যেকটি নাগরিক সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
এর আগে তিনি জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিদের সম্মাননা সূচক ক্রেস্ট প্রদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আশরাফুল ইসলাম।
জুলাই শহিদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে তাদের প্রত্যাশা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এর আগে দুপুর ১২টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং জুলাই শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।



















