শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পেছনে দলের ভেতরের চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি চক্রকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। তাদের দাবি, ওই চক্র শেখ হাসিনাকে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থেকে দূরে রেখেছিল। ২০২৪ সালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা নিজেদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে মনে করেন। তাদের ভাষ্য, বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দলের এক নেতা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ৫ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় মানুষ টেলিভিশনে তা দেখছিল। সেই সুযোগে অনেক নেতা নিজ নিজ বাসা থেকে বের হতে সক্ষম হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক মন্ত্রী বলেন, গ্রেপ্তার হলে পরিবারসহ তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা পরে অনুশোচনা প্রকাশ করেন। এমনকি ৩ ও ৪ আগস্ট দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে তাদের কেউ কেউ অংশ নিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এক নেতা অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত নেওয়া বন্ধ করে দেন। এর জন্য তিনি দলের ভেতরের ‘গ্যাং অব ফোর’ নামে পরিচিত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে দায়ী করেন।
তার দাবি অনুযায়ী, ওই চারজন হলেন শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।
ওই নেতা বলেন, শেখ হাসিনার তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়াকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বড় রাজনৈতিক ভুল হিসেবে মনে করেন। তাদের মতে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জনঅসন্তোষ কিছুটা প্রশমিত হতে পারত এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনাও বজায় থাকতে পারত।
সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেখ হাসিনা সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি।
এ ছাড়া, ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। পরে ছাত্রনেতাদের আটক ও আন্দোলন প্রত্যাহারের চাপ দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতিরও উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, সরকার পতনের পর ২৪ জন রাজনৈতিক নেতা, পাঁচজন বিচারক, বেসামরিক প্রশাসনের ১৯ কর্মকর্তা এবং ২৮ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ৬২৬ জনকে সেনাবাহিনী আশ্রয় দেয়।
তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে কথা বলা আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া ৭৫ বছরের পুরোনো দলটি বর্তমান সংকট কাটিয়ে একসময় পুনর্গঠিত হতে সক্ষম হবে। তাদের মতে, দলকে পুনর্গঠন করতে হলে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে।














