হিমাদ্রি শেখর কেশব, বরগুনা: বরগুনায় চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বিদ্যুৎ বরাদ্দ, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং নিম্নমানের গ্রাহকসেবার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি। সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় বরগুনা প্রেসক্লাব চত্বর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা হাজারো নারী-পুরুষ অংশ নেন।
বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বরগুনা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় ঘেরাও কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ। সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আনিসুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল এবং পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’-এর সদস্যসচিব মুশফিক আরিফ। কর্মসূচিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বরগুনা জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩০ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ পাওয়ায় বাধ্য হয়ে দিনের বিভিন্ন সময় ও রাতেও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তারা বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের বৈষম্য উপকূলীয় জেলার মানুষের প্রতি অবিচার এবং এটি দ্রুত দূর করতে হবে।
এ অবস্থায় বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি স্মারকলিপির মাধ্যমে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বরগুনায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ঘনঘন লোডশেডিং ও ভোল্টেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন, খুঁটি ও ট্রান্সফরমার দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা, গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কোনো ধরনের অযৌক্তিক চার্জ আরোপ না করা এবং উপকূলীয় জেলা হিসেবে বরগুনার বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও দুর্যোগ-সহনশীল করে গড়ে তোলা।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বরগুনার মানুষ এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
এতে আরও বলা হয়, বিদ্যুতের ঘন ঘন ওঠানামার কারণে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোটর, আইপিএসসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে মোমবাতি, হারিকেন কিংবা চার্জ লাইটের আলোতে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের দোকান এবং ইন্টারনেটনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বিঘ্নিত হচ্ছে। মাছ, বরফ ও হিমায়িত খাদ্য সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ীরাও লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন।
স্মারকলিপিতে বরগুনায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের বরাদ্দ বৃদ্ধি, ঘন ঘন লোডশেডিং ও ভোল্টেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধান, জরাজীর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন, খুঁটি ও ট্রান্সফরমার দ্রুত সংস্কার, গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উপকূলীয় জেলা হিসেবে বরগুনার বিদ্যুৎ অবকাঠামো আধুনিকায়নের দাবি জানানো হয়।
ঘেরাও কর্মসূচি শেষে প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী বরাবর বরগুনার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করে। স্মারকলিপির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি, জেলা প্রশাসক এবং বরগুনা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও পাঠানো হয়।
কর্মসূচি থেকে নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে বরগুনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে বিদ্যুৎ অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়াসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তারা বলেন, বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা থেকে বরগুনার মানুষকে আর বঞ্চিত রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
















