কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি দেশের গ্যাস সরবরাহ। সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি খাত এবং আবাসিক গ্রাহক—সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটি সচল করতে আরও ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে শিল্প উৎপাদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহনকে। আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে দুর্ভোগ বেড়েছে, পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যয়।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব একযোগে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। গত এক যুগে গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে গত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে আসছে। এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদন বা এলএনজি আমদানিতে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।
গত সপ্তাহে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত পেট্রোবাংলার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর থেকে টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। তবে দুর্ঘটনার আগেও সরবরাহ ছিল মাত্র ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই সরবরাহ আরও কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কবে কমবে দুর্ভোগ
ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করতে দিনরাত কাজ করছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা। পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন।
তবে টার্মিনালটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট সময় জানানো সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে একটি বয়লার সচল করা গেলে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে চলমান গ্যাস সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে।
তবে এলএনজি টার্মিনালটি আগের পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বিমা-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি যাচাইও সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলেই টার্মিনালটি সম্পূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব হবে।
রান্নার চুলা বন্ধ কিংবা হিমশিম অবস্থা
চলমান গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর মগবাজার, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কলাবাগান, ধানমন্ডি, বাড্ডা, বাসাবো ও কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় পাইপলাইনের গ্যাস মিলছে না। কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাসের চাপ ফিরে এলেও সকাল হতে না হতেই তা আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় সারাদিনই গ্যাসের চাপ খুব কম থাকছে, আবার কোথাও একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাসের অভাবে দৈনন্দিন রান্নাবান্নায় বিপাকে পড়েছেন নগরবাসী। অনেকে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার বা রাইস কুকারে রান্না করছেন। কেউ কেউ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বিকল্প জ্বালানির খরচ বহন করতে না পেরে অস্থায়ীভাবে মাটির বা ইটের চুলা তৈরি করে লাকড়ি ব্যবহার করছেন।
এ পরিস্থিতিতে শুধু দুর্ভোগই নয়, বেড়েছে সংসারের অতিরিক্ত ব্যয়ও। ঘরে রান্না করতে না পারায় অনেক পরিবারকে বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। এতে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
শিল্পে উৎপাদন নেমেছে প্রায় ৩০ শতাংশে
চলমান গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গ্যাসনির্ভর তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটওয়্যার এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিল্প মালিকদের দাবি, অনেক কারখানাই এখন স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। উৎপাদন সচল রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজেল কিংবা এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা দেশের রপ্তানি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ কমে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। সীমিত সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা
গ্যাস সরবরাহে চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা শহরের অনেক স্টেশন দিনের দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। আর যেসব স্টেশন সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে, সেখানে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না চালকেরা।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, একটি সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় সেই চাপ কমে মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ এর চেয়েও কম থাকায় স্টেশন পরিচালনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে সিএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও পরিবহন খাতেও ভোগান্তি বাড়ছে।













