দেশ চালানোর ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বাইরে ‘এই মুহূর্তে’ কোনো বিকল্প দেখতে পাচ্ছেন না নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
তারেক রহমানের সঙ্গে অতীতে হওয়া কথোপকথন তুলে ধরে তিনি বলেন, “যখন আজকের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হননি, তখন তাকে একদিন বলেছিলাম, ‘আপনার সুযোগ আছে মাহাথির মোহাম্মদ হওয়ার, আপনার সুযোগ আছে কামাল আতার্তুক হওয়ার এবং নিশ্চয় সেরকম একটা জিনিস আপনি চেষ্টা করবেন।’“আমি আজও তাই চাই। এ কারণে চাই যে, এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে আমি বিকল্প কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”
সোমবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তারেক রহমানের আমন্ত্রণে মতবিনিময় সভা ও নৈশভোজে কথা বলছিলেন মান্না।রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার এ আয়োজনে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হওয়া ৪১টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সেখানে নতুন সরকারের কাছে নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরে মান্না বলেন, “আমি চাই, এই সরকার ভালো করুক। মাত্র পাঁচ মাস বয়স হয়েছে সরকারের। এখনই ঠিক পুরোপুরি বলা যাবে না এবং আমি মনে করি যে এটা ঠিক ওই অনুষ্ঠানও নয়, যেখানে সমালোচনা-আত্মসমালোচনা করব এখানে।‘‘আমি বলতে চাই ,আপনারা ব্যর্থ হলে, আমি ব্যর্থ হব, দেশ ব্যর্থ হবে, সবাই ব্যর্থ হবে।”
মান্না বলেন, ‘‘আমার বয়স এখন ৭৬। আমি জানি এটা বললে একটু বেয়াদবির মত…। আমার চাইতে বয়স্ক যারা, তারা অনেকেই আছেন। কিন্তু অনেকগুলো বছর ধরে যে রাজনীতি করি, একটা স্বপ্ন হচ্ছে, সেইরকম একটা দেশ করতে চাই, যে দেশ শামসুর রহমানের কবিতার মত— একটা ফুলের বাগান হবে এবং খুব সহজে সেই ফুলের কাছে যেতে পারব; খুব সহজে ঘাসের উপর শুয়ে যেরকম এখানে আছি পায়ের উপর পা দিয়ে… অকারণে মাঝে মাঝে পা নাড়ব, রিলাক্স একটা লাইফ, রিলাক্স একটা দেশ। আমার নিজেকে নিয়ে আমি সামনে একটা স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখতে পাচ্ছি, সেই রকম কিছু।”
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, ‘‘ বিএনপি নিজেই এত বড় একটা দল, আমি জানি, তার মধ্যে অনেকেই আছেন মন্ত্রী হবার মতো, দেশ পরিচালনা করবার মতো। সবাই তো আর মন্ত্রীর দায়িত্ব পাননি, সবাই তো আর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাননি।
“কিন্তু এই দায়িত্ব এই অধিকার যেন আমার থাকে। কোনো ভুল হলে ভুল বলতে পারি এবং ভুল বলবার কারণে যেন আমাকে ভুল বোঝা না হয় এবং তার জন্য যেন দায়ী করা না হয়। গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে যেখানে সমালোচনা করা যায়, অকপটে নিজের কথা বলা যায়। এখন পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে, এটা অব্যাহত থাকবে এইটা আমি চাই।”

একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানর নিজের কর্মকান্ডের মাধ্যমে নতুন নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “খুবই বিনয়ের সঙ্গে বলছি, বর্তমান সরকার দেশ চালাচ্ছেন, বর্তমান সরকারের যিনি প্রধান, তিনিসহ সবাই নতুন নতুন উদাহরণ তৈরি করবার চেষ্টা করছেন। আগের যে সমস্ত খারাপ উদাহরণ ছিল, সেগুলো ভেঙে ফেলবার চেষ্টা করছেন এবং নতুন করে সবার মধ্যে আশা জাগাবার চেষ্টা করছেন।
“কিন্তু আমার এই কথা বলার মানে এই নয়, এর মধ্যে কোনো প্রশ্ন নেই, এর মধ্যে কোন ভুলের অবকাশ নেই । এমন নয় যে পা পিছলে পড়ে যেতে পারেন না। কিন্তু সজাগ থাকতে হবে যেন পা পিছলে না যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ কামনা করি সুস্বাস্থ্য কামনা করি এবং তার সাফল্য কামনা করি।”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘আমরা দীর্ঘ ১৫ বছর আজকে এখানে যারা উপস্থিত আছি, আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে। আমাদের অনেক নেতাকর্মী সেদিন কারাগারে গেছেন, তারা অনেকে গুম হয়েছেন, অনেকে খুন হয়েছেন।
“আজকে আমাদের সামনে একটা নতুন সুযোগ এসেছে। সেই সুযোগটা হচ্ছে, একটা উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেন আমরা গড়ে তুলতে পারি। আর সেই লক্ষ্যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাজ করে চলেছেন।”তিনি বলেন, “এই পাঁচ মাসে যে কাজগুলো হয়েছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে বলার মত কাজ।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন,, “এই মুহূর্তে বিএনপি এবং তারেক রহমানের সামনে যে ঐতিহাসিক সময়টা দিয়েছে, এই ভূমিকাটা পালন করবার, এই মুহূর্তে অন্য কোনো ব্যক্তি নাই। এটা তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিপরিষদ, তার সরকার, তারা প্রজ্ঞা দূরদর্শিতা বুদ্ধিমত্তার সাথে সবাইকে নিয়ে চলতে পারার যে রাজনৈতিক শৈলী, তারা যদি এটা অর্জন করতে পারেন, বিএনপির ভবিষ্যৎ আছে, আমাদের যুগপথ আন্দোলনের শরিকদের, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আছে।”
তিনি বলেন, ‘‘আজকে এখানে যে অনুষ্ঠানে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নসু ভাই, তিনি গুলশান অফিস থেকে আমাদেরকে আপনার (প্রধানমন্ত্রীর) দাওয়াতের কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আপনার ক্যাবিনেটের কোনো মন্ত্রীর অথবা দুর্দিনে আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যারা ছিলেন, তাদের কোনো সময় হয়নি শীর্ষ নেতাদের হ্যালো বলার, কথা বলার, বা আপনার আমন্ত্রণ পৌঁছিয়ে দেওয়ার।
‘‘এটা মর্যাদার প্রশ্ন, সন্মানের প্রশ্ন, এটা সবাইকে একুমেডেটেড করার প্রশ্ন। একসঙ্গে চলতে গেলে এই মর্যাদা বোধটা আমাদের লাগবে। এই মর্যাদাবোধটা ছাড়া আমরা কিন্তু এগোতে পারব না।”
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বলেন, ‘‘গত পাঁচ মাসে এই সরকারের অনেক অর্জন। সবচেয়ে বেশি ভালো অর্জন হয়েছে হজ নিয়ে। ৫০ বছরের মধ্যে কোনো অভিযোগ ছাড়া এবার প্রথম হজ আদায় হয়েছে।“
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, “বিএনপি কান্ডারি হয়ে গেছে, আমরা এখন ফুটপাতে বসে গেছি। আমরা মানসিকভাবে অনেক কষ্ট পাচ্ছি। অনেক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমাদেরকে দাওয়াত পর্যন্ত দেওয়া হয় না। আমাদের নেতাকর্মীদের কোথাও কোনো মূল্যায়ন নাই। কেন্দ্রীয়ভাবেও নাই, জেলাতেও নাই। এই যে দূরত্বটা সৃষ্টি হলো, কেন হলো?”
একপর্যায়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘‘সুব্রত ভাই, বিব্রত হওয়ার দরকার নাই। আপনার সঙ্গে আমাদের সবসময় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে।“
অনুষ্ঠানে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘‘২০০৬ সাল যখন থেকে ‘ফ্যাসিবাদি’ দৌরাত্ম আরম্ভ হয়েছিল, গত ২০ বছর, আজকে এখানে অনেকে আছেন, আবার অনেকে নেই। আবার অনেক হাজার হাজার নেতাকর্মী যারা জীবন দিয়েছেন… এই সবকিছু মিলিত হয়েই আজকে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এই ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ হয়েছি। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারাই শহীদ হয়েছেন, যারাই ছিলেন, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছি।”
অনুষ্ঠানস্থল যমুনায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তিনি শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন। এরপর একসঙ্গে বসে খাবার খান।
বিএনপি মহাসচিবের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ও গণদলের চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরীও বক্তব্য রাখেন ।
ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনে পর এই প্রথম যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে বসলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।












