আল আমিন-বাংলাদেশে এক সময় পরকীয়ার ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকত। কিন্তু আজ প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে—পরকীয়ার জেরে স্বামী বা স্ত্রী হত্যার ঘটনা, আত্মহত্যা, বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়; ধীরে ধীরে এটি একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সমাজের মূল ভিত্তি পরিবার। এই পরিবারই মানুষকে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখায়। কিন্তু যখন দাম্পত্য সম্পর্কে বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু স্বামী-স্ত্রী নন; এর প্রভাব পড়ে সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো সমাজের ওপর।
উদ্বেগের বিষয় হলো, পরকীয়াকে অনেক ক্ষেত্রেই “ব্যক্তিগত বিষয়” বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। একটি অবৈধ সম্পর্কের কারণে যখন একটি পরিবার ভেঙে যায়, শিশুরা বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, কিংবা সংঘটিত হয় হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা—তখন সেটি আর কেবল ব্যক্তিগত থাকে না; সেটি একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোপন যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন সম্পর্ক এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রযুক্তি নিজে কখনো অপরাধী নয়, কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক গড়ে তোলা, দাম্পত্য জীবনের সমস্যা বাইরে সমাধান খোঁজা এবং প্রতারণাকে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এর পাশাপাশি আমাদের সমাজেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। ব্যস্ত জীবন, পারিবারিক যোগাযোগের অভাব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধৈর্যের সংকট, এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়াও সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়াচ্ছে। কিন্তু সম্পর্কের সংকটের সমাধান কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা হতে পারে না।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তানরা। তারা মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক দ্বন্দ্ব শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, পরিবারে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা দেখা দিলে তা লুকিয়ে না রেখে পারিবারিকভাবে বা প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল সম্পর্কের গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত। চতুর্থত, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে—পরকীয়াকে বিনোদন বা রোমাঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন না করে এর সামাজিক পরিণতি তুলে ধরা।
আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে পরকীয়াকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল বা হত্যার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়। তবে মনে রাখতে হবে, পরকীয়া নিজে নয়, বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো আইনগতভাবে বিচারযোগ্য—আর সেই বিচার যেন দ্রুত ও নিরপেক্ষ হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের সমাজ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সমাজও দুর্বল হবে। আর সমাজ দুর্বল হলে রাষ্ট্রও তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বাইরে থাকতে পারবে না।
পরিবার টিকিয়ে রাখা শুধু একজন স্বামী বা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্ব। ভালোবাসা মানে বিশ্বাস, দায়িত্ব ও সম্মান। সেই বিশ্বাস ভেঙে কোনো ব্যক্তি সাময়িক আনন্দ পেতে পারেন, কিন্তু তার মূল্য অনেক সময় একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না হয়ে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই এখনই সময়—পরিবারকে রক্ষা করার, সম্পর্ককে সম্মান করার এবং নৈতিক মূল্যবোধকে আবারও সমাজের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার।
আল আমিন,প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ




















