নিজস্ব প্রতিবেদক : একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতমূলক লেখাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা সাইবার ট্রাইব্যুনালের একটি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার ১৫ জন অভিযুক্ত দাবি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক। তারা মামলাটি অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার বা খারিজের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযুক্তদের দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, Amardesh24.news-এ গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা এবং উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান নিয়ে ইয়াংটাইগার গ্রুপ-এর একটি মতামতমূলক লেখা প্রকাশিত হয়। ওই লেখায় দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামত তুলে ধরা হয়েছিল বলে দাবি করেন তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করেই ওই লেখা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সেই মতামত প্রকাশের ঘটনাকেই কেন্দ্র করে জনৈক আক্কাসসহ কয়েকজন ব্যক্তি ২০২৬ সালের ৫ মে ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর সাইবার ট্রাইব্যুনাল পিটিশন মামলা নং-১৮৭/২০২৬।
অভিযুক্তদের ভাষ্য, প্রকাশিত লেখাটিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানো হয়নি। বরং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে একটি মতামত তুলে ধরা হয়েছে। সে কারণে একটি মতামতমূলক লেখাকে ফৌজদারি মামলার বিষয়বস্তু করা মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করেন।
তাদের অভিযোগ, মামলাটি প্রকৃতপক্ষে আইনগত প্রতিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং লেখক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করার লক্ষ্যেই এটি দায়ের করা হয়েছে। এ ধরনের মামলা ভবিষ্যতে নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশে নিরুৎসাহিত করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভিন্নমত প্রকাশ, সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীন মতপ্রকাশ গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই অধিকার ক্ষুণ্ন হলে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও জনস্বার্থে মতবিনিময়ের পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অভিযুক্তদের মতে, সংবিধান নাগরিককে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিলেও সেই অধিকার প্রয়োগের কারণে যদি বারবার মামলা ও আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তাহলে তা স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই তারা আদালতের কাছে মামলার প্রকৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আদালতের প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা আশা করছেন, মামলার বিষয়বস্তু, প্রকাশিত লেখার প্রকৃতি এবং সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞ আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, যে কোনো আইনি প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা; মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা নয়।https://amardesh24.news/%e0%a6%89%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a6%be/
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে মামলাটি প্রত্যাহার অথবা খারিজ করার আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে এই মামলার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
মামলার নথি অনুযায়ী, অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন –
১। আবু সাঈদ (২৮)
পিতাঃ মোঃ শামসুল হক
মাতাঃ মমতাজ বেগম
ঠিকানাঃ দড়িকান্দি, বাঞ্ছারামপুর, দড়িকান্দি -৩৪১৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।
২। আফরোজা খানম চৌধুরী (৩৮)
পিতাঃ জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী
মাতাঃ আয়েশা খানম চৌধুরী
ঠিকানাঃ বৌরিচং হাউজ, ঠাকুর পাড়া, বাগান বাড়ী, কোতওয়ালি মডেল, কুমিল্লা সদর- ৩৫০০, কুমিল্লা।
৩। আল ইমরান আহমেদ (২৭)
পিতাঃ তমজিদ আলী
মাতাঃ আয়েশা বেগম
ঠিকানাঃ নিজ কুরুয়া, ওসমানী নগর, সিলেট।
৪। আসাদুর রহমান দিপু (৩৫)
পিতাঃ মোঃ নুরুল হক
মাতাঃ রায়না বেগম
ঠিকানাঃ বারকাপন, মৌলভীবাজার সদর, বারকাপন-৩২০১, মৌলভীবাজার।
৫। বোগদাদ পিয়ারি রুবি (৪৬)
পিতাঃ এস কে এম মনজুর ই মোরশেদ সোহাব
মাতাঃ বেগম রোকেয়া
ঠিকানাঃ কুচাইতলী, কোতওয়ালী মডেল, রাজাপাড়া ৩৫০০, কুমিল্লা।
৬। জান্নাতুন নাঈম জান্নাত (২৭)
পিতাঃ মোঃ মোফাজ্জুল হোসেন নিমাড়
মাতাঃ খালেদা বেগম চৌধুরী
ঠিকানাঃ শাহাজালাল উপশহর, ব্লক-ই, রোড নং ০২, হাউস নং- ২৬, শাহপড়ান, সিলেট সদর-৩১০০, সিলেট।
৭। মোঃ আব্দুর রহমান (৩৪)
পিতাঃ আবু তাহের
মাতাঃ রায়হানা বেগম
ঠিকানাঃ মাসিমপুর, ধলিয়া, ফেনী সদর, ফেনী।
৮। মোঃ রাকিবুল হাফিজ (৩৪)
পিতাঃ মোঃ আজিজুর রহমান
মাতাঃ মোছাঃ মমতাজ বেগম
ঠিকানাঃ ১৮ বখতিয়ারাবাদ, বোয়ালিয়া মডেল, সপুরা-৬২০৩, রাজশাহী।
৯। মোঃ রাশেদুজ্জামান সরকার (৪৪)
পিতাঃ আমজাদ হোসেন সরকার
মাতাঃ রাশিদা বেগম
ঠিকানাঃ কেশবপুর, বাঘা, কিশোরপুর-৬২৮০, রাজশাহী।
১০। মিজানুর রহমান (৫১)
পিতাঃ আতাউর রহমান
মাতাঃ হোসনে আরা রহমান
ঠিকানাঃ দক্ষিণ মিলিক বাঘা, বাঘা-৬২৮০, রাজশাহী।
১১। মহিউদ্দিন মিয়া (২৭)
পিতাঃ জিয়াউল কাইয়ুম মিয়া
মাতাঃ হালিমা বেগম
ঠিকানাঃ বোয়ালমারী বাজার, বোয়ালমারী, ফরিদপুর।
১২। মুহাম্মাদ জাকির হোসাইন (৪৬)
পিতাঃ নূর মোহাম্মদ সরদার
মাতাঃ খাদিজা বেগম
ঠিকানাঃ পাঁচকাঠি, হাটুরিয়া, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর।
১৩। সাদিয়া শারমিন আয়েশা (২০)
পিতাঃ মোফাজ্জুল হোসেন নিমাড়
মাতাঃ খালেদা চৌধুরী
ঠিকানাঃ শাহজালাল উপশহর, ব্লক- ই, রোড নং ০২, হাউস নং- শাহপড়ান, সিলেট সদর- ৩১০০, সিলেট।
১৪। মোঃ মুরাদ হোসেন (৫০),
পিতাঃ পিতাঃ মৃত মোঃ আব্দুস ছাত্তার
মাতাঃ মোছা সুফিয়া বেগম
ঠিকানাঃ সারদিয়ার, শাঁখারি পাড়া, আতাইকুলা, পাবনা।
১৫। এইচ. এম. ওবায়দুল ফাত্তাহ
পিতা: মোঃ ইউনুস আলী
মাতা: বিলকীস সুলতানা
ঠিকানা: ফ্ল্যাট নং ২০১
১৪/৪ রহমান ভিলা, পাকাপুল
পশ্চিম মাসদাইর
ডাকঘর: ফতুল্লা–১৪০০
নারায়ণগঞ্জ সদর
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা
তবে এ বিষয়ে মামলার বাদী বা তার আইনজীবীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। একইভাবে আদালতের পক্ষ থেকেও মামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রযোজ্য আইনের সীমারেখা—উভয় বিষয়ই আদালতের বিবেচ্য। কোনো প্রকাশনা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, কিংবা সেটি সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের অধিকারভুক্ত কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমেই হবে।
এদিকে অভিযুক্তরা তাদের যৌথ বিবৃতিতে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তারা বিচার বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আইনের প্রতি সম্মান রেখে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছেন, মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার যাতে অযথা আইনি হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।



















