পঞ্চগড় প্রতিনিধি- পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় প্রতিপক্ষের জমি দখলে নিতে এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে একটি অস্থায়ী কালী মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এরপর ঘটনাটিকে ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হলেও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি মূলত জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাজানো একটি নাটক।
গত বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের যুগিকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে এলাকার উত্তেজনা নিরসনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের জমির বিরোধ ও মন্দির স্থাপন:
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধামোর এলাকার অনিল চন্দ্র রায়ের পরিবার ও লক্ষ্মীচরণ রায়ের পরিবারের মধ্যে ৬ একর ৬৬ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। গত বছর লক্ষ্মীচরণ তাঁর মালিকানাধীন জমিটি স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। ক্রেতা জাকির যেন জমিটি দখল করতে না পারেন, সেজন্য অনিল চন্দ্র প্রায় ছয় মাস আগে ওই জমিতে একটি অস্থায়ী কালী মন্দির স্থাপন করেন এবং সেখানে প্রতিমা বসান।
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী উভয় পক্ষকে নিয়ে আগামী ১২ জুলাই সমঝোতা বৈঠকের দিন নির্ধারণ করেন। একই সাথে বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন প্রশাসন।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও সংঘর্ষের সূত্রপাত:
স্থানীয়রা জানান, ইউএনওর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুধবার দুপুরে অনিল চন্দ্র ও তাঁর লোকজন বিরোধপূর্ণ জমিতে চাষ করতে যান। এতে ক্রেতা জাকির হোসেন ও তাঁর ভাই জুলকার রানা বাধা দেন। এ সময় অনিল ও তাঁর পরিবারের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে জাকিরকে আটকে রেখে লাঠিসোঁটা দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করেন।
মারধরের একপর্যায়ে অনিল চন্দ্রের লোকজন বাঁশঝাড়ে থাকা তাঁদের নিজেদের তৈরি অস্থায়ী মন্দিরের প্রতিমা নিজেরাই ভেঙে ফেলেন। এরপর ভাঙা কালীমূর্তিটি গুরুতর আহত ও অবরুদ্ধ জাকিরের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ঘটনাটিকে ‘সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা’ বলে গুজব ছড়ানো হয়।
মারধরে গুরুতর আহত জাকিরকে প্রথমে আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে রাতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য:
জমির আদি মালিক লক্ষ্মীচরণের স্ত্রী শেফালী রানী বলেন, “অনিলরা আগে জাকিরকে প্রচুর মারধর করেছে। পরে নিজেরাই কালীমূর্তি ভেঙে নাটক সাজিয়েছে। ওই স্থানে কয়েক মাস আগে একটি ঘর তুলে তারা প্রতিমা রেখেছিল। তারা নিজেরা অপরাধ করে মুসলিমদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।”
আহত জাকিরের ভাই জুলকার রানা বলেন, “ইউএনও স্যারের নিষেধ করার পরও তারা জমিতে চাষ দিতে গেলে আমরা দুই ভাই বাধা দিই। তারা আমাদের ওপর হামলা করে আমার ভাইয়ের পা ভেঙে দিয়েছে। পরে নিজেরাই মূর্তি ভেঙে ভিডিও ধারণ করে গুজব ছড়ায়। ভিডিওটি ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে এটা তাদের সাজানো নাটক।”
অন্যদিকে অনিলের ভাই কান্তপাল রায় দাবি করেন, “আমরা জমিতে চাষ দিতে গেলে জাকির বাধা দেয় এবং আমাদের কালীমূর্তি ভেঙে ফেলে। পরে আমরা তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছি। এই ঘটনার পর রাতে আমাদের ঘরবাড়িতে দুই-তিন শ মানুষ হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে।”
প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য:
আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান বলেন, “এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু নয়, সম্পূর্ণ জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের। মুসলিম যুবকের হাতে কালীমূর্তি ভাঙার যে দাবি করা হচ্ছে, প্রাথমিক তদন্তে তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী বলেন, “সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাজানো। এটি মূলত জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনা। আগামী ১২ জুলাই তাদের নিয়ে বসার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই তারা মারামারিতে জড়ায়। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি।”
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধ মীমাংসার ঘোষণা:
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর ১২টা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনিল চন্দ্র, লক্ষ্মীচরণ এবং জাকিরের প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসে প্রশাসন। পরবর্তীতে আটোয়ারী প্রেসক্লাবে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উভয় পক্ষ নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে জমি সংক্রান্ত এই বিরোধটি সম্পূর্ণ মীমাংসা করে নিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।











