ইকোনমিস্টের রিপোর্ট: যুদ্ধে প্রবাসী আয়ে বড় ধাক্কা, ঘরে ফিরছে হাজারো শ্রমিক

0
1

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রবাসী আয়ের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত জীবনের আশায় বহু তরুণ যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছিলেন, যুদ্ধের কারণে সেই পথ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নেপালের তরুণ পুষ্প কুমার চৌধুরীর মতো অনেকেই সম্প্রতি কাজ পেলেও সংঘাতের কারণে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।

ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নিহতদের একটি বড় অংশই অভিবাসী শ্রমিক। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের বহু শ্রমিক এর শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকার পথ হঠাৎ করেই থেমে গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই কোটির বেশি মানুষ উপসাগরীয় ছয়টি দেশে কাজ করছিলেন, যা এক দশকের তুলনায় অনেক বেশি। তবে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে গেছে। বাংলাদেশ থেকে গত বছরের মার্চে যেখানে প্রায় ৯২ হাজার শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন, এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৩১ হাজারে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, শ্রমিক পাঠানো অন্যান্য দেশও উদ্বেগে রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নতুন শ্রম অনুমোদন কমিয়ে দিয়েছে নেপাল। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধাক্কা। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় পেয়েছে, যা দেশের মোট অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেপালের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি, যেখানে প্রবাসী আয় মোট অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এমনকি ভারতের মতো বড় অর্থনীতিতেও এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি সামান্য সংকুচিত হলেও প্রবাসী আয় তুলনামূলক বেশি হারে কমে যায়। ইতোমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে, এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ধীরগতি দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর ওপর, যারা ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে।

বাস্তব চিত্র আরও কঠিন। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা সাইমুম ইসলাম জানান, তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবারের ছয়জন সদস্য। চাকরি হারানোর পর পুরো পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই অর্থের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় হয়, যা ভবিষ্যতে শ্রমশক্তিকে উচ্চ আয়ের পেশায় যেতে সহায়তা করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের সামনে সবচেয়ে বড় আশা হলো দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ফলে ভবিষ্যতে শ্রমিকের চাহিদা আবার বাড়তেও পারে।

অন্যদিকে, বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার কথাও উঠছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডকে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে সেখানে সুযোগ তৈরি করা সহজ নয়। ভাষা, দক্ষতা ও নিয়োগ কাঠামোর সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবুও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক শ্রমিক নতুন ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের দিকে ঝুঁকছেন, যাতে ভবিষ্যতে ভালো সুযোগ পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ কি এশিয়ার অভিবাসী শ্রমিকদের পুরোনো গন্তব্য বদলে নতুন পথ তৈরি করতে বাধ্য করবে? এখনই এর উত্তর স্পষ্ট নয়, তবে এর প্রভাব যে দীর্ঘমেয়াদি হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY