• Home
  • দেশ
  • তিস্তার চরে ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘুরছে, কাউনিয়ায় বদলাচ্ছে কৃষক ও চালকের ভাগ্য
Image

তিস্তার চরে ঘোড়ার গাড়ির চাকা ঘুরছে, কাউনিয়ায় বদলাচ্ছে কৃষক ও চালকের ভাগ্য

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত ২২টি চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি। বালুময় পথ, কাদামাটির রাস্তা ও শুকিয়ে যাওয়া নদীর শাখা-প্রশাখা পেরিয়ে কৃষকের উৎপাদিত ফসল হাটবাজারে পৌঁছে দিচ্ছে এই বাহন। একদিকে কৃষকের ফসল বাজারজাতকরণ সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন চার শতাধিক মানুষ।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় ধান, পাট, আলু, বাদাম, ভুট্টা, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ, কুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষির সম্ভাবনা থাকলেও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকার কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা। অনেক স্থানে ভ্যান, রিকশা, ট্রলি কিংবা ট্রাক চলাচল করতে পারে না। ফলে উৎপাদিত ফসল পরিবহনে কৃষকদের বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

আগে পরিবহনসংকটের কারণে অনেক কৃষককে জমি থেকে ফসল সংগ্রহের পর স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হতো। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার বাড়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক সহজে তাঁদের উৎপাদিত ফসল হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারছেন। এতে সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ছে, পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়দের কাছে ঘোড়ার গাড়ি পরিচিত ‘চরের বাহন’ হিসেবে। দুর্গম ও বালুময় পথে চলাচলের উপযোগী হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনে এর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশেষ করে রবি মৌসুমে ধান, আলু, বাদাম, ভুট্টা, কুমড়া ও অন্যান্য ফসল পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা বেশি থাকে।

উপজেলার ঢুসমারা চরের ঘোড়ার গাড়িচালক আঃ করিম ম-ল বলেন, শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে রবি ফসলের মৌসুমে তাঁর আয় বেশি হয়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আয় করেন তিনি। তবে আয় নির্ভর করে কাজের পরিমাণ ও মৌসুমের ওপর। তিনি বলেন, “চরের রাস্তায় অন্য যানবাহন সহজে চলতে পারে না। ঘোড়ার গাড়িতে কৃষকের ফসল হাটে পৌঁছে দেওয়া যায়। এতে কৃষকের সুবিধা হচ্ছে, আবার আমাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। এই গাড়ি চালিয়েই সংসার চালাচ্ছি।”

হারাগাছ ইউনিয়নের চর নাজিরদহ গ্রামের ঘোড়ার গাড়িচালক আঃ খালেক বলেন, চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় তাঁর আয়ও বেড়েছে। ঘোড়ার গাড়ি তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আরাজি হরিশ্বর গ্রামের কৃষক দরদি বলেন, “ঘোড়ার গাড়ির কারণে এখন চর থেকে ফসল হাটে নিয়ে বিক্রি করতে পারছি। আগে পরিবহনের সমস্যায় অনেক সময় কম দামে ফসল বিক্রি করতে হতো। এখন নিজেরাই পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বালাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আনছার আলী, টেপামধুপুর ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম ও শহীদবাগ ইউপি চেয়ারম্যান আঃ হান্নান, হরাগাছ ইউপি চেয়ারম্যান রাজু আহমদ জানান, ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ এ আর আল মামুন বলেন, ঘোড়া চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের উপযোগী একটি প্রাণী। তবে ঘোড়ার সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন বলেন, ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে চরাঞ্চলের কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। দুর্গম এলাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে এ বাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কাউনিয়ার চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সহজে ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে সারা বছর চলাচল উপযোগী রাস্তা নির্মাণ এবং পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়ির চালকদের নিরাপত্তা, ঘোড়ার স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »