দেশের শীর্ষ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্য পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মাঠপর্যায়ে একটি আসনের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নেতাদের কাছ থেকেই পেয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, দলীয় কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার চরম ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে টিআইবি জানিয়েছে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো কাউন্সিল করেনি।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
মনোনয়ন বাণিজ্যের সুস্পষ্ট অভিযোগ তিন দলের বিরুদ্ধে
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যের বরাতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে টিআইবি জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রভাবশালী তিনটি দলের বিরুদ্ধে সরাসরি মনোনয়ন বাণিজ্যের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দল তিনটি হলো- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
দলগুলো প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করলেও এটি যে মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তা দলীয় প্রতিনিধিদের বয়ানেই উঠে এসেছে বলে জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্য সম্পর্কে যে তথ্য গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেই প্রাপ্ত। মাঠপর্যায়ের নির্বাচনে কোনো কোনো প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকার মতো ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নিজস্ব পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমে মনোনয়ন বাণিজ্যের যে অভিযোগ প্রকাশিত হয়, দলগুলোর নিজস্ব ভাষ্যেই তার সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হচ্ছে।
তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে মাঠপর্যায়ে নির্বাচনে একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, সেখানে নির্বাচন কমিশনে পুরো দল মিলে বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। দলগুলোর এই আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে পর্দার আড়ালে বা টেবিলের নিচে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং অবৈধ অর্থায়নের পথ সুগম হচ্ছে।
এক দশক ধরে কাউন্সিলহীন বিএনপি
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের সংকট তুলে ধরে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি প্রধান রাজনৈতিক দল দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো কাউন্সিল আয়োজন করেনি। পরে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে টিআইবির গবেষকরা জানান, কাউন্সিলহীন এই দলটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দলগুলোর অভ্যন্তরে নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়া, তৃণমূল পর্যায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব বাছাইয়ের অনীহার কারণে পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বপরায়ণতা ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। দেশে বর্তমানে অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত হচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, নিয়মিত কাউন্সিল ও তৃণমূলের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে দলগুলো ভেতর থেকে শক্তিশালী হওয়ার বদলে কেবল ওপরের স্তরের মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।














