Image

বিশ্বজুড়ে একের পর এক দেশে জেন-জির উত্থান, এবার নজর ভারতে!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম। দুর্নীতি, বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও নাগরিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তাদের বিক্ষোভ অনেক ক্ষেত্রেই সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পর নেপাল এবং মাদাগাস্কারেও তরুণদের আন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এবার ভারতেও সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে সরব হয়েছেন তরুণরা।

ফলে বিশ্বরাজনীতিতে জেন-জির আন্দোলন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। তবে একপর্যায়ে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘের হিসাবে, ওই আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলে তার সরকারের পতন ঘটে। বাংলাদেশের এই ঘটনা তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

এর আগে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জোরালো হয়ে ওঠে তরুণদের প্রতিবাদ।

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন। রাজাপাকসে পরিবারের শাসনামলে জমে থাকা ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় ‘আরাগালয়া’ আন্দোলন। সিংহলি ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘সংগ্রাম’। তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নেন। ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।

দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ নেপালেও তরুণদের বিক্ষোভ সরকারকে বড় সংকটে ফেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও এর পেছনে ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। হাজারো তরুণ ও শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের কেউ পার্লামেন্ট ভবনে আগুন দেন, আবার কেউ রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। তীব্র জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। নেপালের ঘটনাও দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সঙ্গে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত যুক্ত হলে তা দ্রুত বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারেও তরুণদের বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। ‘আমরা বেঁচে থাকতে চাই, টিকে থাকতে নয়’—এমন স্লোগানে রাজপথে নামেন হাজারো তরুণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে পরে যুক্ত হয় সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও অসন্তোষ। পরিস্থিতি একপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। তরুণদের আন্দোলনের মুখে দেশটিতে সরকারের পতন ও ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে।

এবার ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তরুণদের প্রতিবাদ আলোচনায় এসেছে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও এ আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে। তবে ভারতের এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হয় এবং দেশটির রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, তরুণদের আন্দোলনের পেছনে কারণ ও প্রেক্ষাপট এক নয়। কোথাও অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কোথাও দুর্নীতি ও বৈষম্য, আবার কোথাও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। তবে এসব আন্দোলনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ, সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সরকারি পদক্ষেপ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বিক্ষোভের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে সব আন্দোলনের পরিণতি সরকার পতন নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও পরবর্তী সময়ে সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। তাই জেন-জির আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এসব আন্দোলন রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি ও জনআকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও মাদাগাস্কারের অভিজ্ঞতার পর ভারতের পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকেরা। তরুণদের এই প্রতিবাদ কত দূর এগোবে, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের বিস্তার, জনসমর্থন, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্ম এখন আর শুধু পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রেই সেই পরিবর্তনের গতিপথ নির্ধারণেও ভূমিকা রাখছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »