কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এই জানাজা সম্পন্ন হয়।জানাজায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
নিষ্পাপ এই কিশোরকে শেষ বিদায় জানাতে সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে মানুষের ঢল নামে।এ সময় স্বজন, শিক্ষক ও সহপাঠীদের অশ্রুসজল উপস্থিতি পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ও শোকাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
জানাজা পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, আমরা অপ্রতিমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। অপ্রতিম হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
বিচার তো হবেই, কিন্তু আমরা তো এই সন্তানকে আর ফিরে পাব না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই প্রশ্ন—ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
জানাজায় শোকে স্তব্ধ অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার এই একটাই ছেলে ছিল। আমার বাচ্চাটা কুমিল্লার মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় বড় হয়েছে। আপনারা ওকে নিজেদের সন্তানের মতোই ভালোবেসেছেন।
ওর বাবা হিসেবে আজ আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি—ও যদি অজান্তে কারো মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকে, তবে দয়া করে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন।
ড. নাহিদা বেগমের সহকর্মী অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান মিলকী বলেন, সম্পর্কে আমি অপ্রতিমের প্রতিবেশী মামা হই। আপনারা সবাই ওকে চিনতেন। কুবির ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে অনেকেই তাকে দেখেছেন। এই নিষ্পাপ শিশুটিকে আপনারা সবাই ক্ষমা করে দেবেন এবং তার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জানাজা শেষে অপ্রতিমের লাশ কুমিল্লার গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ১১টায় তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে, শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পশ্চিম সানন্দা এলাকার একটি পাহাড়ি জঙ্গল থেকে ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার বিকেলে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করে পুলিশ। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার রাত ৮টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সোয়া ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
এর আগে শনিবার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
এ সময় তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান।মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাই মরলো কেন? প্রশাসন জবাব দে’, ‘বিচার বিচার বিচার চাই’, ‘অপ্রতিম হত্যার বিচার চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা চারটি দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি ও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া কুমিল্লা শহর ও আশপাশের এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কুমিল্লা পুলিশ প্রশাসন, সদর দক্ষিণ থানা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বশীলদের স্বীকার করার দাবি জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের জরুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডসহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কুমিল্লা প্রশাসনকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানানো হয়।দাবি বাস্তবায়ন না হলে মহাসড়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষার্থীরা।
কুবি শিক্ষার্থী হাসান অন্তর বলেন, ‘আমরা ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছি।এই ১২ ঘণ্টার মধ্যে এসপিকে আমাদের কাছে এসে জানাতে হবে, তদন্তে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১২ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে আমরা মহাসড়ক অবরোধ করব। এটা শুধু একটি ঘটনার বিষয় নয়; সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখব, প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়। এরপর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অবস্থান অনুযায়ী পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে। ’












