• Home
  • অর্থ-বাণিজ্য
  • তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু, উদ্বোধন করলেন প্রতিমন্ত্রী
Image

তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু, উদ্বোধন করলেন প্রতিমন্ত্রী

দেশের গ্যাস সংকটের মধ্যে আজ শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের শুভ সূচনা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এই গ্যাস সরবরাহ শুরু হলো। তিতাস ২৮ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় চলতি বছরের ১৯ জুন। কূপটির গভীরতা ৩৬০১ মিটার (প্রায় ১৩ হাজার ফুট) এবং খননকাজে ব্যয় হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। এই কূপ থেকে দৈনিক ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

গ্যাস সরবরাহ কাজের উদ্বোধনকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করেই চলমান সংকট মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে প্রায় তিনগুণ অতিরিক্ত ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন এভাবে অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উত্তরোত্তর উন্নয়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হক, অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. রফিকুল আলম, প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক প্রমুখ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, আজ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় আমাদের শিল্প কারখানার চাকা সচল হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে। এছাড়া তিতাস-২৮, তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ এবং তিতাস-৩১ কূপ খনন কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে সম্মিলিতভাবে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট মিলিয়ে ৩৩শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এতে করে ২০৩০ সাল নাগাদ সম্ভাব্য ৫০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে দেশের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ঢাকা মেইলকে জানান, দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা ৩৮০০ এমএমসিএফডি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সংকটের পূর্বে সরবরাহ ছিল ২৬০০ থেকে ২৭০০ এমএমসিএফডি। এই সংকটের ফলে সরবরাহ কমে হয়েছে ২৩৫০ এমএমসিএফডি। তবে সরকারের জরুরি উদ্যোগের ফলে গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আমরা অনশোর ও অফশোর উভয় ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান কাজ জোরদার করেছি। প্রতিমন্ত্রী জানান, আজ চালু হওয়া তিতাস-২৮ কূপ আমাদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক এবং এটি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিতকে আরও মজবুত করবে।

আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদের আরও চারটি কূপ থেকে প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ খননের কাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে মোট প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, উদ্বোধনের পরপরই কূপটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে আমদানি-নির্ভরতার চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।

‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন জানান, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস-২৮, ২৯, ৩০ ও কামতা-২ নম্বর কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপ আজ উৎপাদনে গেল এবং অন্য কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। গভীরতার কারণে কূপটির খনন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

মাহমুদুল নবাব আরও জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে কূপটির লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তিতাস-২৯ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপের খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৪ হাজার ৫০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলে পাঁচটি কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এর মজুদ আনুমানিক দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিতাস-৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কূপটির মাধ্যমে আরও প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুদ যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ মজুদের পরিমাণ নিশ্চিত করতে কূপটির খনন শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে এবং পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই নতুন মজুদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ৩১টি কূপ খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৭টির খননকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৫০টি কূপ খনন সম্পন্ন হলে ১৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। বিদ্যমান দুটি এফএসআরইউ থেকে ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরিকল্পিত আরও দুটি এফএসআরইউ থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »