সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুভেদে এ দেশের প্রকৃতি যেমন নানা রকম ফল-ফসলে সমৃদ্ধ হয়, তেমনি মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও আসে বৈচিত্র্য। এরই ধারাবাহিকতায় ভাদ্র মাস এলেই গ্রামবাংলায় শুরু হয় তাল খাওয়ার উৎসব। পাকা তাল দিয়ে তৈরি তালের পিঠা, বড়া, পায়েসসহ নানা মুখরোচক খাবার এখন গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।বর্তমানে বাংলা ভাদ্র মাস। শরৎকালে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই পাকা তাল দিয়ে নানা ধরনের খাবার তৈরির ধুম পড়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় তাল দিয়ে তৈরি খাবারের এই ঐতিহ্য চলে আসছে।
সরেজমিনে কাউনিয়ার বিভিন্ন বাজার ঘুরে তাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় তালগাছের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে বাজারে আগের মতো তাল পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে এবার তালের দামও কিছুটা বেশি।
তাল ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ভাদ্র মাস উপলক্ষে পাকা তাল দিয়ে তালের পিঠা, তালের বড়া ও তালের পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামে এ উৎসব চলে আসছে। যাদের বাড়িতে তালগাছ নেই, তারা হাট-বাজার থেকে তাল কিনে আনেন। এরপর সহজ প্রক্রিয়ায় তাল চিপে রস বের করে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া হয়। পরে গুড় বা চিনি, দুধ ও গরম মসলা দিয়ে তা পাতিলে জ্বাল করে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করেন গৃহিণীরা।
তিনি আরও জানান, এলাকায় প্রচলিতভাবে তালের দুটি জাত রয়েছে ‘মহিষা তাল’ ও ‘দুধা তাল’। মহিষা তাল দেখতে কালচে ও আকারে বড়। অন্যদিকে দুধা তাল কিছুটা লালচে রঙের এবং আকারে তুলনামূলক ছোট।কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় মোড়ে তাল বিক্রেতা নিলা চন্দ্র জানান, তিনি প্রতিদিন গ্রাম থেকে তাল কিনে এনে বাজারে বিক্রি করেন। এতে তার কিছুটা আয় হয়। তিনি জানান, গাছপাকা ছোট তাল ২০ থেকে ২৫ টাকা, মাঝারি তাল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা এবং বড় তাল ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তবে আর কয়েকদিন পরই তাল বিক্রির মৌসুম শেষ হয়ে যাবে।
হরিশ্বর গ্রামের বাসিন্দা নুর আমিন বলেন, তিনি তকিপল বাজার থেকে ১০০ টাকা দিয়ে তিনটি তাল কিনেছেন। সেই তাল থেকে রস বের করে বাড়িতে তালের পিঠা ও বড়া তৈরি করে খেয়েছেন। তালের পিঠা ও বড়া খেতে খুবই সুস্বাদু বলেও জানান তিনি।
গৃহিণী স্মৃতি বলেন, তাল দিয়ে তৈরি পিঠা ও বড়া খেতে তার খুব ভালো লাগে। তাই প্রতিবছর তাল মৌসুমে তিনি বাড়িতে তালের পিঠা ও বড়া তৈরি করেন। পরিবারের সবাই এসব খাবার পছন্দ করেন। গ্রামের মানুষের কাছেও তাল অত্যন্ত প্রিয়। তাই এখন গ্রামগঞ্জে তালের পিঠা, বড়া, পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি ও খাওয়ার ধুম পড়েছে।
তালের পুষ্টিগুণ ঃ তালে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান। এতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকায় দাঁত ও হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া তালে ভিটামিন বি-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পাকা তাল খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে পারে এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে শরীরের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। তাল আকারে বড় হলেও এর বাজারমূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকে। ফলে মৌসুমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যেও তালের চাহিদা বাড়ে।
কৃষি কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন জানান, গ্রামগঞ্জে আগের তুলনায় তালগাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এ কারণে আগের মতো সহজে তাল পাওয়া যায় না। তালগাছের সংখ্যা বাড়াতে বেশি করে তালবীজ রোপণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তালগাছ সংরক্ষণ ও স¤প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার।














