পঞ্চগড় প্রতিনিধি: দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে লক্ষ্যমাত্রার রেকর্ড পরিমান রাজস্ব আদায় হয়েছে। যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। এটি চতুর্থদেশীয় সম্ভবনাময় স্থলবন্দর। জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বন্দর থেকে ৪২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের নির্ধারিত ২৩০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
সূত্র মতে, আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২৫৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ে এমন উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধিতে সম্ভাবনাময় এ স্থলবন্দর ঘিরে নতুন করে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দীর্ঘদিন পাথর আমদানী নির্ভর থাকলেও বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ছে। ফলে বন্দরটির বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪ কোটি ৭ লাখ টাকায়। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ১১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের জন্য ৫৬৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাথরের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের আমদানী-রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতি এসেছে। নেপালে বাংলাদেশ থেকে পাট, সুতলি, ঝাড়ু, চিটাগুড়, পেঁয়াজ, ঝুট কাপড়, জুস ও সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ভারতেও প্রাণ কোম্পানির বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে ভারত থেকে চা কারখানার বিভিন্ন সরঞ্জামসহ নানা পণ্য আমদানি হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসার পরিধি বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবী, বিভিন্ন পণ্যের আমদানী-রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানিও রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। ভারতে তেল সংকটের সময় দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ইন্দো-বাংলা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাবান্ধা বন্দর দিয়ে জ্বালানি তেল আমদানী করা হয়েছে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের পোর্ট ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় বন্দর দিয়ে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক ট্রাক এসেছে। এতে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে।
রাজস্ব আদায় ও বাণিজ্য বাড়লেও বন্দরের সেবার মান ও অবকাঠামো নিয়ে কিছু অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। তাদের অভিযোগ, পণ্য খালাসে ধীরগতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি পণ্য আনলোডে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আমদানী-রপ্তানিকারক গ্রুপের আহ্বায়ক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাহীন বলেন, আগের তুলনায় বাংলাবান্ধা বন্দর সুন্দর পরিবেশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায় বেড়েছে। আগে বন্দরটি আমদানী নির্ভর থাকলেও বর্তমানে রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুসা বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালকে ঘিরে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যকেন্দ্র। আগের তুলনায় রাজস্ব আদায় ও সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, বন্দরের অবকাঠামো ও সেবার মান আরও উন্নত করা গেলে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও আরও বাড়বে। তবে এই স্থলবন্দরটিতে চীনের সঙ্গে বানিজ্য সুবিধা যুক্ত হলে দেশের অর্থনীতিতে নব দিগন্তের দ্বার উম্মোচিত হবে। কর্মসংস্থান হবে শত মানুষের।পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে বন্দরের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, দ্রত পণ্য খালাস এবং ব্যবসাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা জরুরী বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।














