কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে যা-ই করেন আর না করেন, রায় লিখতে পারবেন না, এটা হবে অনুচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তার মতে, প্রযুক্তির নানা কাজে এআই ব্যবহার করা গেলেও রায় লেখার ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব বিচারবোধ ও বিবেকের বিকল্প এটি হতে পারে না।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এআইয়ের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত বিস্তৃত উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে। তাই প্রযুক্তিটির প্রয়োগ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এআই ব্যবহারের ঝুঁকি বোঝাতে যুক্তরাজ্যের একটি মামলার উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবাদপত্রে তিনি এমন একটি ঘটনার কথা দেখেছেন, যেখানে একটি মামলার রায়ে অন্য একটি মামলার রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল। বিচারক সেই রেফারেন্স গ্রহণ করে রায় দেন এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি আদালত ওই রায় অনুসরণ করে।
পরে গবেষণায় দেখা যায়, যে মামলার রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল, বাস্তবে এমন কোনো মামলার অস্তিত্বই ছিল না। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিচারক বিব্রত হন। তবে ততক্ষণে ওই রায় হয়ে গেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, “এআইয়ের ঝুঁকি হচ্ছে, এটি যাচাই না করে ব্যবহার করা খুব কঠিন।”
চলতি বছরের ২৭ আগস্ট বিচারিক জীবনের ২৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ করে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে রায় লেখার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আপনি এআই দিয়ে যা-ই করেন আর না করেন, রায় লিখতে পারবেন না। এটা হবে অনুচিত।”
রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি। প্রথমত, মামলার ঘটনা বা ‘ফ্যাক্ট’ সঠিকভাবে বুঝতে হবে। এরপর সেই ঘটনার সঙ্গে প্রযোজ্য আইন ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বা উপধারা প্রয়োগ করতে হবে। সবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিচারকের নিজস্ব বিবেক ও নৈতিক বোধকে কাজে লাগাতে হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “প্রথম হচ্ছে ফ্যাক্ট, তারপরে আইন। লাস্টলি, আপনি যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, আপনি কিন্তু এই ফ্যাক্ট আর আইনের সঙ্গে যে জিনিসটি আমি ব্যবহার করি, বা এমন প্রত্যেক বিচারক ব্যবহার করেন, সেটা হচ্ছে আপনার বিবেক। এটা কি সঠিক? দ্যাট ইজ এথিকস, বিবেক।”
তার মতে, মানুষের এই বিবেককে এআই দিয়ে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। বিবেক একজন মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি থেকে আসে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানবিক বিচারবোধের ভূমিকা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, “বিবেক একজন মানুষের নিজের থেকে আসে। এটা তার স্বপ্রণোদিত চিন্তাশক্তি। মানুষ যখন চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলবে, তখন সে অনেক ছোট হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনোভা শেলী।













