ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, আলোচনার আড়ালে তেহরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে। গত সোমবার দেওয়া এ মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ইরানের নেতৃত্বের অবস্থান ও কৌশল নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তায় রয়েছে ওয়াশিংটন।
নিজেকে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে সক্ষম নেতা হিসেবে তুলে ধরলেও ইরানের ক্ষেত্রে সেই কৌশল কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের আচরণ শুধু তাঁর ক্ষোভই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ওই নৌপথ ব্যবহারে শুল্ক আরোপের দাবিতে অনড় রয়েছে ইরান। এ দাবি আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে সুবিধাজনক সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর। যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত ভোটারদের একাংশের সমর্থন কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জটিল রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার কেন্দ্রকে বুঝতে গিয়ে অতীতেও বহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট সমস্যায় পড়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় সব মার্কিন প্রশাসনই তেহরানের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া বুঝতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সফলতা মেলেনি।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দীর্ঘ প্রায় ২০ মাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করেন তিনি। যদিও রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ওই চুক্তির সমালোচনা করেছিল, তবুও ওবামা এটিকে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সাবেক কর্মকর্তা কেনেথ পোলাকের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্পই সম্ভবত ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি চাপও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু কোনো কৌশলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলার মাধ্যমে তেহরান–ওয়াশিংটন সংঘাত শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সময়ে তিনি দাবি করেন, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণেও তাঁর ভূমিকা থাকবে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন হামলায় ইরানের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হলেও দেশটিতে কোনো গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। বরং কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থা আরও শক্ত অবস্থান নেয়।
গত মার্চে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, তিনি তাঁর বাবার তুলনায় আরও কঠোর অবস্থানের এবং পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে বেশি আগ্রহী। তবে তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছিলেন, তা গুরুত্ব দেয়নি তেহরান। এমনকি সরাসরি বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রস্তাবেরও কোনো সাড়া দেয়নি ইরান।
এর পরও ট্রাম্প আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। গত এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি বলেন, চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলে ইরান নিজেদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে ফিরতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ কিছু বিষয়ে আলোচনায় বসতে তারা প্রস্তুত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের উত্থাপিত কয়েকটি প্রধান শর্ত শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই ভালো বোঝেন’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এখনো কঠোর অবস্থানেই রয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় বড় ধরনের সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনর্গঠনে তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব আগ্রহী নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে গেলেও দেশটির ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলতে পারেননি বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
চলমান সংঘাতের সময় ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও তাঁর প্রতিনিধিদের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কখনো তাঁদের ‘পাগল’, কখনো ‘যৌক্তিক’, কখনো ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ আবার কখনো ‘সম্পূর্ণ উন্মাদ’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে তাঁর অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ট্রাম্প নন—ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতার আশায় যুক্তরাষ্ট্রের আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইরানের আদর্শিক অবস্থান এবং ক্ষমতার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তাঁর মতে, এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ পাননি।
সুজান ম্যালোনি আরও মনে করেন, চলমান যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটিতে বিকল্প কোনো কার্যকর ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই সীমিত।
ইরানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত। অতীতে এ কাঠামোর মধ্য থেকেই এমন কিছু প্রভাবশালী নেতা উঠে এসেছিলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন। তবে ওয়াশিংটনের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সফলতা পায়নি।
মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মূল্যায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের নেতৃত্বই ওয়াশিংটনের নীতি ও কৌশল ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই হয়তো অনেক ভালো বোঝেন।’
‘তিক্ত হতাশা’
ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টায় ব্যর্থতার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৮০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও একই ধরনের কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তেহরানে মার্কিন দূতাবাস থেকে ১৯৭৯ সালে জিম্মি হওয়া ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করতে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন আলোচনার অনুমোদন দিয়েছিলেন।
কার্টারের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে জানা যায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং শীর্ষ নেতৃত্বের মতপার্থক্য নিয়ে তিনি নিয়মিত বিশ্লেষণ করতেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো তিনিও বিশ্বাস করেছিলেন যে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান সম্ভব।
১৯৮০ সালের শুরুতে কার্টার মনে করেছিলেন, জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে একটি সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবরুদ্ধ শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেবে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে।
তবে সেই আশাবাদ বেশিক্ষণ টেকেনি। কার্টারের ভাষায়, পুরো ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত ‘তীব্র হতাশা’য় পরিণত হয়। কারণ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি হঠাৎ করেই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।
খোমেনির এই সিদ্ধান্তে শুধু মার্কিন কর্মকর্তারাই নন, ইরানের প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাও বিস্মিত হন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়লে জিম্মিদের উদ্ধারে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন কার্টার। কিন্তু সেই অভিযানও ব্যর্থ হয়।
অবশেষে দীর্ঘ আলোচনা ও টানাপোড়েনের পর একটি সমঝোতার মাধ্যমে কার্টারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বের শেষ দিনেই ৫২ জন মার্কিন জিম্মি মুক্তি পান।
গোপন অস্ত্রচুক্তি
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা বহুবার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রোনাল্ড রিগ্যান থেকে বিল ক্লিনটন—একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানের কারণে।
১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর এক সহযোগীকে একজন ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ীর পাঠানো বার্তা যাচাই করার নির্দেশ দেন। ওই বার্তায় দাবি করা হয়, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের কিছু মধ্যপন্থী নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হতে পারেন। রিগ্যান এটিকে একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন।
এর পর লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিনিময়ে গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এই গোপন উদ্যোগ পরে ইতিহাসে ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। কারণ, মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অস্ত্র বিক্রির অর্থ গোপনে নিকারাগুয়ার কমিউনিস্টবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর তহবিলে পাঠানো হয়েছিল।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে রিগ্যান প্রশাসন বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং রিগ্যানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ইরানে কথিত মধ্যপন্থী নেতৃত্বের যে তথ্যের ভিত্তিতে পুরো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবসম্মত ছিল না। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) তদন্তে জানতে পারে, পুরো পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি সেই ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ী একজন প্রতারক ছিলেন। পরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ক্ষমা চান। তবে ইরানের মধ্যপন্থী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ধারণাকে তিনি তখনও সমর্থন করেন।
এর এক দশকের বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে আবারও সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালে ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানান। এমনকি ১৯৭৯ সালের মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের ঘটনাতেও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
জবাবে ক্লিনটন প্রশাসনও কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়। ইরানের পেস্তা ও কার্পেট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের দীর্ঘদিনের কিছু অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করে সমঝোতামূলক অবস্থান নেয়।
সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট ১৯৫৩ সালে ইরানের সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএর সমর্থনের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, যিনি ইরানের পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত তেলশিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন।
তবে এসব উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব প্রেসিডেন্ট খাতামির সংস্কারমুখী নীতির বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
মেডেলিন অলব্রাইটের বক্তব্যের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা প্রকাশ্যে নাকচ করে দেন। তাঁর এই অবস্থানের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়।
ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি পরে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন, আলী খামেনির বিশ্বাস ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক কখনোই সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘ বৈরিতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি। ওই সমঝোতার আওতায় সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার একটি অংশ শিথিল করা হয়।
ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশা ছিল, তৎকালীন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে হওয়া এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভিত্তি তৈরি করবে। তবে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তিতে সম্মতি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখাননি।
সে সময় ওবামার সমালোচকেরা দাবি করেছিলেন, রুহানিকে ঘিরে ওয়াশিংটনের আশাবাদ অতীতে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামিকে ঘিরে করা প্রত্যাশার পুনরাবৃত্তি মাত্র। তাঁদের মতে, ইরানের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত ছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস আরও গভীর হয় ২০১৮ সালে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রকে পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং আগের তুলনায় আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর জবাবে ইরানও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ দুই দেশকে ধীরে ধীরে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। সেই উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় গত বছরের সহিংস সংঘাতের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, সংঘাত শুরুর পর থেকেই কূটনৈতিক কৌশলে ওয়াশিংটনের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তেহরান। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য আগ্রহ ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে।
রস বলেন, ইরান সময়কে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর নীতি অনুসরণ করে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধান চাইলেও সেই তাড়াহুড়া অনেক সময় আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান দুর্বল করে দেয়।





















