সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার একটি পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে একশ্রেণির সুদখোর চক্র (দাদন ব্যবসায়ী) দীর্ঘদিন ধরে অবাধে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দাদন ব্যবসায়ীদের কষাখাতে নিঃস্ব হচ্ছে শতশত পরিবার। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সর্বত্রই চলছে সুদের রমরমা কারবার। কর্তৃপক্ষ নিরব দর্শক।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার গ্রাম ঘুরে সুদের টাকার রমরমা ব্যবসার চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় বিভিন্ন সমিতি, সংস্থা কিংবা সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করে সুদের কারবার পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ পেতে জটিলতা ও হয়রানির কারণে সহজে টাকা পাওয়ার আশায় সাধারণ মানুষ এসব সুদভিত্তিক ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুদের ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ফাঁকা চেক, স্বাক্ষরযুক্ত সাদা কাগজ কিংবা ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা প্রদান করে থাকে। পরে এসব নথি ব্যবহার করে তারা ঋণগ্রহীতাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি ও আদালতে মামলা করে। শিক্ষক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সবাই জিম্মি সুদের এই কারবারের কবলে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমপিও ভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক, কলেজ শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ গ্রামের সাধারণ মানুষ। অনেকেই সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে পরিবার-পরিজন ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নিজপাড়া গ্রামের মৃত প্রবেশ চন্দ্রের পুত্র পরমেশ^র বেশ কয়েকজন সুদারুর টাকা পরিশোষ করতে না পেরে দোকান ও সংসার ছেরে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। তার কাছে পাওনা সুদখোররা টাকার জন্য তার বড় ভাই প্রহলাদের দোকানে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব সুদখোররা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি গ্রামে বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মুখোশধারী সমাজসেবক এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের অনেকেই সুদের কারবার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা সমবায় বিভাগের নিবন্ধন ছাড়াই নামে-বেনামে সমিতি গঠন করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আবার বেশীর ভাগই ব্যাক্তি কেন্দ্রিক পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দাদন ব্যবসায়ী প্রভাবশালী মহল সন্ত্রাসী ও মাস্তানও লালন-পালন করে, যাতে কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে না পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু কথিত এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সহজ-সরল গ্রামীণ মানুষ। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। তাদেও মতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও হাট-বাজারে গড়ে ওঠা সমিতি ও সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তদন্ত করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে চিহ্নিত হবে সুদের কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়। এলাকাবাসী বলেন, “সুদের এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা না গেলে দরিদ্র মানুষ আরও নিঃস্ব হয়ে পড়বে এবং অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে।” তারা অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংক ঋণ সহজিকরন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।














