রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ ছাত্র ও পথচারীরা আহত হয়েছেন।আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা কলেজে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া
ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ঢাকা কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে দুপুর দেড়টায় ক্যাম্পাসে মিছিল করে কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক মোহম্মদ মামুন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে কলেজের গ্যালারি-২ তে শহীদ পরিবারকে সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেক ভাইয়ের নেতৃত্বে ৫/৬ গ্যালরি ডেকেরেশনের কাজ করছিলেন। এমন সময় ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে ২০/২৫ জন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এসে মালেক ভাইসহ অন্যান্যদের মারধর করে।’
জবিতে ছাত্রদল-জকসু-ছাত্রশক্তির মধ্যে সংঘর্ষ, তদন্ত কমিটি গঠন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাক্কাধাক্কি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তন ও শহীদ মিনারের সামনে এসব ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ ত্বরান্বিত করা, অস্থায়ী হল নির্মাণ এবং মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত ল্যাব-সুবিধা ও চিকিৎসক নিয়োগের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে ঢুকতে যান জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঢুকতে চাইলে প্রবেশমুখে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে জকসু নেতাদের ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে জকসু ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা মিলনায়তনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেমিনার শেষে অতিথিরা বের হওয়ার সময় শহীদ মিনারের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও মারামারি হয়।
এ ঘটনায় জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক, ছাত্রশক্তির জবি শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের অনেকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
হামলার বিষয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে আসার পর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায় এবং জকসু ও ছাত্রশক্তির শীর্ষ নেতাদের মারধর করে।
এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউজিসির চেয়ারম্যানকে অপমান করার জন্য ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের বিনয়ের সঙ্গে সরে যেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা না শুনে এগিয়ে এলে অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদলেরও একাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
এদিকে সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে। জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়, জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন এ কর্মসূচিতে উচ্চপর্যায়ের অতিথির উপস্থিতিতে এমন হামলা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ এবং চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আজম খানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় থমথমে পরিস্থিতি
রাজধানীর ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় হল দখলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হল দখলকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিকেলের দিকে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। শুরুতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা পাল্টা অবস্থান নিয়ে প্রাঙ্গণের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের দেশীয় অস্ত্র হাতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং মুখোমুখি অবস্থান নিতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতেও দেশীয় অস্ত্র হাতে সংঘর্ষে জড়ানোর দৃশ্য দেখা গেছে। এসব ভিডিওতে কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে সহপাঠীরা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের সঠিক সংখ্যা ও পরিচয় জানা যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
ঘটনার পর পুলিশ ক্যাম্পাসে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
এ ঘটনায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।















