• Home
  • দেশ
  • পঞ্চগড়ে চা বাগানে পোকা মাকড়ের আক্রমণ, দিশেহারা চা চাষী
Image

পঞ্চগড়ে চা বাগানে পোকা মাকড়ের আক্রমণ, দিশেহারা চা চাষী

পঞ্চগড় প্রতিনিধি: নানা উদ্যোগের পর দেশের ততৃীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল পঞ্চগড়ে দাম পাওয়ায় পঞ্চগড়ে সমতলে চা উৎপাদন বাড়ছে। তবে ক্ষতিকারক পোকা মাকড়ে দিশেহারা চা চাষী ও বাগান মালিকরা।পোকা প্রার্দূভাবে অনেক চা চাষী চা পাতা উত্তোলনের পরিবর্তে চা এর গাছের আগা কেটে দিয়েছেন। কচি পাতার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় অনেক বাগানের উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে।

চা চাষীরা বলছেন কীটনাশক দিয়ে হচ্ছেনা কাজ। অন্যদিকে চা বোর্ড বলছে, চা চাষীদের অজ্ঞতা এবং ভালো মানের কীটনাশক দিতে না পারায় পোকার আক্রমন বাড়ছে।তবে চাষীদের দাবী, বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাঙ্খিত ফল মিলছে না। বেড়েছে উৎপাদন ব্যায়। এবার চা পাতার দাম ভালো পেলেও শুধুমাত্র পোকা-মাকড়ের দাপটে লোকসানের শঙ্কায় উদ্বিগ্ন চা চাষীরা।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছে, এটি মৌসুমী সমস্যা। পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ফলনও ব্যাহত হচ্ছে। তবে এজন্য চা চাষীদের অজ্ঞতা, ভালো মানের কীটনাশক না পাওয়া এবং কীটনাশকের অপ্রয়াগকে দায়ী করছে চা বোর্ড।

চা বোর্ড সূত্র জানায়, উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সমতলের চা এখন অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর সমতল জমিতে চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতি বছর বাড়ছে চা চাষের পরিধি। গতবছর চা উৎপাদন মৌসুমে এক হাজার ৫২৮টি নিবন্ধিতসহ মোট সাত হাজার ৩৪৮টি ছোট-বড় চা বাগানে মোট আট কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ দশমিক ৮৭ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয়েছে। তৈরিকৃত চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি চা কারখানা কাঁচাপাতা সংগ্রহ করে তৈরিকৃত চা উৎপাদন করছে।

চা বাগান মালিক ও চাষীরা বলছেন, চা উৎপাদনের হিসেবে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত পেয়েছে পঞ্চগড়ের সমতলের চা। এবার চায়ের ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে চা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা বাগান।

পঞ্চগড় উপজেলা সদরসহ তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার কয়েক হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমতলের চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্র চা চাষের বিস্তারের ফলে জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র চা কারখানা, সংগ্রহ কেন্দ্র ও পরিবহনভিত্তিক ব্যবসা। এর ফলশ্রতিতে বেড়ে কর্মসংস্থান। চা পাতা তুলেই একজন চা শ্রমিক পান কমপক্ষে ৪০০-৭০০ টাকা। তবে অনেক পরিবারে ৩-৪ জন সদস্য চা পাতা তুলতে যায় চা বাগানে। সব মিলিয়ে তাদের আয় বেশ ভালো। পরিবারগুলি সাবলম্বী হচ্ছে। পরিবারে সচ্ছলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরেজমিন দেখা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবারও চায়ের সবুজে ভরে গেছে বিস্তৃর্ণ এলাকা।

সাধারণত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলে চায়ের উৎপাদন। এসময়ের মধ্যে ৭-১০ দফায় বাগান থেকে চা পাতা তোলা হয়। তবে জুলাই-আগস্ট চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে ৩-৪ দফায় চা পাতা তোলা হয়।চাষীরা বলছেন, পোকা-মাকড়ের কারণে চাহিদামতো পাতা পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে লাল মাকড়সা, লুপার ক্যাটারপিলার, কারেন্ট পোকা, মশক পোকা, শুশুনি পোকার আক্রমণে দিশাহারা চা চাষীরা। অতিরিক্ত খরচে বারবার কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না বলে জানান তারা।বর্ষা মৌসুমে সাধারণত চা গাছে দ্রততম সময়ে নতুন কুঁড়ি ও পাতা গজায়, যা ৯ মাসে চা উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ঠিক এসময়েই বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন চা বাগানে প্রথমে পাতার নিচে ছোট ছোট লাল মাকড়সা দেখা যায়। এরপর পাতার সবুজ অংশ শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। অন্যদিকে লুপার ক্যাটারপিলার কচি পাতা খেয়ে ফেলে। এতে নতুন পাতা গজাতেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে নির্ধারিত সময়েও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

পাতা তোলার বিপরীতে অনেক ক্ষুদ্র চা চাষী বাগান থেকে পাতা কর্তন করে ফেলে দিয়েছেন। চা বোর্ডের পক্ষ থেকে আক্রান্ত বিভিন্ন বাগান নিয়মিত পরিদর্শন করে নির্ধারিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, আক্রান্ত পাতা অপসারণ, সময়মতো স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক চাষির অভিযোগ, বাস্তবে এসব পরামর্শ মেনে চললেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কয়েক দিন পর আবার নতুন করে পোকার আক্রমণ দেখা দিচ্ছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল লাল স্কুল এলাকার চা বাগান মালিক রহিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রতি রাউন্ডেই তিন থেকে চারবার কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। কীটনাশকের দামও দ্বিগুণ বেড়েছে। এতে খরচ আমাদের অনেক বেড়েছে। অথচ উৎপাদন কমেছে। আমরা সাধারণত বিঘা প্রতি ১০০০-১২০০ কেজি পর্যন্ত কাঁচা পাতা পাই। এখন ৮০০-৯০০ কেজির বেশি পাওয়া যায় না। চা উৎপাদন এবার অনেক কমে যাবে।’

আরও হতাশার কথা জানান তেঁতুালিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষী আমজাদ হোসেন বলেন, প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ পাতা তুলতাম, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিয়েছি, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার পোকার আক্রমণ শুরু হচ্ছে। একদিকে ওষুধের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয়ও কমে গেছে।

পঞ্চগড় বিসিক এলাকার কর্ণঝরা চা কারখানার স্বত্বাধিকারী আব্দুল মজিদ। বলেন, বর্তমানে চা চাষীরা চায়ের ভালো দাম পাচ্ছেন। কারণ চায়ের ভরা মৌসুমে আমরা কারখানা মালিকরা চাহিদামতো চা পাচ্ছি না। বিভিন্ন বাগানে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য উৎপাদন কমে যাওয়া চাহিদা অনুযায়ী চায়ের কাঁচা পাতা পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের হিসাব অনুযায়ী আমরাও চা উৎপাদন করতে পরবো না।’

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন বলেন, এবার চায়ের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বিভিন্ন বাগানে পোকা-মাকড়ের কিছু আক্রমণ রয়েছে।এ কারণে ফলন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে চা চাষিদের কিছুটা অজ্ঞতা এবং কীটনাশকের অপপ্রয়োগসহ ভালো মানের কীটনাশক না পাওয়ার কারণেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘চা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে চাষিদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা যেহেতু একটি মৌসুমভিত্তিক কীটপতঙ্গের আক্রমণ, এজন্য মৌসুম শেষে এমনিতেই আক্রমণ অনেকটা কমে যাবে। ফলে উৎপাদনে তেমন প্রভাব পড়বেনা।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »