পাঁচ মাস ধরে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকার কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব। ইরান, ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির মুখে এবার পাল্টা অভিযানের পথে হাঁটছে রিয়াদ।
গত এক সপ্তাহে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুঁশিয়ারির পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গত এক দশকে দেশটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী ছিল। সেই লক্ষ্যেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল রিয়াদ। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় সেই কৌশল কার্যত ভেঙে পড়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি ভিন্ন দিক থেকে একযোগে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ায় সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যদিও দেশটি সামরিক আধুনিকায়ন এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে, তবুও বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিস্তৃত তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
হুতিদের হামলায় নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূলে সৌদির দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা। এতে জাজান এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদির দুটি তেলবাহী ট্যাংকারও হামলার শিকার হয়।
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হওয়ায় দেশটির বড় অংশের তেল রপ্তানি এখন হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পরও ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চলতি মাসে সানার বিমানবন্দর ঘিরে উত্তেজনার পর হুতি-সৌদি সম্পর্ক আবারও অবনতির দিকে যায়। এরই মধ্যে সৌদি-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইরাক থেকে ড্রোন হামলা, পাল্টা জবাব
সোমবার ও মঙ্গলবার দক্ষিণ ইরাক থেকে সৌদির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব হামলায় ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা জড়িত এবং হুতিরা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে।
এর জবাবে মঙ্গলবার ভোরে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইরাকে মিলিশিয়াদের বিভিন্ন ঘাঁটিতে যৌথ বিমান হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত।
শিয়া মিলিশিয়াদের জোট পিএমএফের দাবি, ওই হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সৌদিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
ইরানি হুমকি ও বাড়ছে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাহেদ ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন সৌদি আরবের অন্যতম বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। এসব হুমকি মোকাবিলায় দেশটি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সহযোগিতা করা আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকাও তারা বিবেচনায় রাখবে। ফলে ভবিষ্যতে সরাসরি ইরান-সৌদি সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে রিয়াদের সামনে দুটি পথ খোলা—সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো অথবা ধারাবাহিক হামলা সহ্য করা। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি, অর্থনৈতিক মেগা-প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানও সৌদি আরবের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।











