• Home
  • দেশ
  • কাউনিয়ার নামের উৎস কাউনই হারিয়ে যাচ্ছে, কমছে আবাদ
Image

কাউনিয়ার নামের উৎস কাউনই হারিয়ে যাচ্ছে, কমছে আবাদ

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যে ফসলের ইতিহাস, সেই কাউন চাষই এখন বিলুপ্তির পথে। একসময় এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে পরিচিত কাউন ছিল গ্রামীণ জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, কৃষকদের অনাগ্রহ, ন্যায্যমূল্যের অভাব এবং কার্যকর সরকারি উদ্যোগের ঘাটতিতে ঐতিহ্যবাহী এ ফসল হারিয়ে যেতে বসেছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলের গ্রাম গুলো ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে আর কাউনের আবাদ হয় না। কোথাও কোথাও হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক শখের বশে সামান্য জমিতে কাউন চাষ করছেন। অথচ একসময় এসব চরাঞ্চলজুড়ে দেখা যেত কাউনের সবুজ সমারোহ।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় কাউন ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ফসল। গ্রামীণ আতিথেয়তায় কাউনের পায়েস, ক্ষীরসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার পরিবেশন ছিল আভিজাত্য ও মর্যাদার বিষয়। প্রায় দেড় যুগ আগেও চরাঞ্চলের অনেক পরিবার ভাতের বিকল্প হিসেবে কাউন খেতেন। সময়ের পরিক্রমায় খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়ার পাশাপাশি কমেছে এ ফসলের আবাদ।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম, আশানুরূপ ফলন না পাওয়া এবং বাজারজাতকরণের সমস্যায় কাউন চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন তাঁরা। চর ঢুসমারা গ্রামের কৃষক আবেদ আলী বলেন, “আগে কাউন চাষ করে সংসার চলত। এখন ফলন কম, বাজারে দাম নেই। তাই বাধ্য হয়ে অন্য ফসল চাষ করছি।”

চর নাজিরদহ গ্রামের কৃষক ময়েজ মন্ডল বলেন, “ভুট্টা, ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা কাউন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।” গদাই গ্রামের কৃষক আবুল হোসেনের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী এক যুগের মধ্যে কাউনের চাষ পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাউন চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকার তথা কৃষি বিভাগের দৃশ্যমান উদ্যোগ, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নেই। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ফসলটি চাষের আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাউনের আবাদ এতটাই কমে গেছে যে এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন বলেন, “এখন কাউন মূলত পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু শৌখিন পাখি পালনকারী এর ক্রেতা। আমরা কৃষকদের ধানের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও প্রতিকূল পরিবেশে চাষযোগ্য কাউন ফসলটির এখনও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রণোদনা, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে এ ফসলের আবাদ পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।

এলাকাবাসীর দাবি, কাউনিয়ার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী কাউন ফসল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে একসময় এ অঞ্চলের পরিচয় বহনকারী ফসলটি কেবল ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »