দুর্দান্ত বোলিং, নিখুঁত ফিল্ডিং আর দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে দিয়ে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জিতেছে আফগানিস্তান। শুক্রবার শারজায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে জিম্বাবুয়েকে ৭ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের করে নেয় তারা। পুরো প্রতিযোগিতায় দাপট দেখানোর পর ফাইনালেও ব্যাটে-বলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে আফগানরা।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে আফগানিস্তানের বোলারদের তোপে ৪৩.৩ ওভারে মাত্র ১৬৯ রানে অলআউট হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। জবাবে ৩৪.৩ ওভারেই ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় আফগানিস্তান।
আফগানিস্তানের জয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইব্রাহিম জাদরান। প্রতিযোগিতায় নিজের দ্বিতীয় অর্ধশতক তুলে নেওয়া এই ব্যাটার অধিনায়ক রহমত শাহর সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে গড়েন ৮২ রানের জুটি। জাদরান ৭০ রানে অপরাজিত থাকেন। ৩৫তম ওভারে চার মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন হাসমতউল্লাহ শহিদি।
এর আগে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দেন আফগান বোলাররা। ৪১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে দলের সেরা বোলার ছিলেন রশিদ খান। টানা ছয় ইনিংসে অন্তত তিনটি করে উইকেট নিয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয় বোলার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন তিনি।
আফগানিস্তানের পেসার ফজলহক ফারুকি, অফস্পিনার মোহাম্মদ নবী ও পেসার বিলাল সামি দুটি করে উইকেট নেন। এক উইকেট শিকার করেন আজমতউল্লাহ ওমরজাই। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের তালিকায় শীর্ষে থাকা ওমরজাই বল হাতে অবদান রাখার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও নজর কাড়েন আফগানিস্তানের খেলোয়াড়েরা।
জিম্বাবুয়ের হয়ে একাই লড়াই করেন অধিনায়ক সিকান্দার রাজা। ৬৮ রানের ইনিংসে তিনটি ছক্কা ও চারটি চার মারেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সে কোনো এক দিনের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে অর্ধশতক করা প্রথম ব্যাটার হন রাজা।
দলের শুরুটা অবশ্য ছিল ভয়াবহ। দ্রুত প্রথম তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। ফারুকির বলে বোল্ড হন তাদিওয়ানাশে মারুমানি। এরপর ব্রায়ান বেনেটকে নিজের বলে নিজেই দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় ক্যাচ নিয়ে ফেরান ওমরজাই। পরের ওভারে তাফাদজওয়া সিগার উঁচুতে খেলা বল এক হাতে তালুবন্দী করে অসাধারণ ক্যাচ নেন এএম গজনফর।
১৩তম ওভারে ব্রেন্ডন টেলরকে উইকেটরক্ষকের ক্যাচে পরিণত করেন সামি। তখন ৫৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল জিম্বাবুয়ে।
এরপর রাজা ও রায়ান বার্ল মিলে দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখার পাশাপাশি রশিদের প্রথম স্পেলও সামলে নেন তারা। কয়েকটি চার মেরে জুটি এগিয়ে নেওয়ার পথে ৩০ রানে বার্ল জীবন পান, যখন তার ক্যাচ ছাড়েন জাদরান। রাজা অর্ধশতক পূর্ণ করলে মনে হচ্ছিল, এই জুটি হয়তো দলকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেবে।
টুর্নামেন্টের ফাইনালে অর্ধশতক করা জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় অধিনায়ক হন রাজা। এর আগে ১৯৯৭ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে ৫১ রান করেছিলেন অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল। তবে অর্ধশতক পূর্ণ করার পরপরই নবীর বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন বার্ল। ডিপ স্কয়ার লেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্যাচটি নেন সামি।
এরপর নবীর দ্বিতীয় শিকার হন ওয়েসলি মাধেভেরে। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে বল মিস করলে প্যাডে লেগে বল দূরে সরে যায়। তবে দারুণ ক্ষিপ্রতায় বল ধরে একটিমাত্র গতিতে স্টাম্প ভেঙে দেন উইকেটরক্ষক রহমানউল্লাহ গুরবাজ। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়ে ৩০০ উইকেট পূর্ণ করেন নবী।
এরপর আক্রমণে ফিরে দ্রুত তিনটি উইকেট তুলে নেন রশিদ। ব্র্যাড ইভান্সকে এলবিডব্লিউ করে ফেরানোর পর পপিং ক্রিজের অন্তত দুই গজ পেছন থেকে বল ছেড়ে নিউম্যান নিয়ামহুরিকে বোল্ড করেন তিনি। এরপর রাজাকে ফিরিয়ে জিম্বাবুয়ের বড় সংগ্রহের শেষ আশাটুকুও শেষ করে দেন রশিদ। এর আগে তার বলে মিডউইকেটের ওপর দিয়ে ৯৮ মিটারের বিশাল ছক্কা মেরেছিলেন রাজা।
রশিদ চতুর্থ উইকেটের অপেক্ষায় থাকলেও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা ও ব্লেসিং মুজারাবানি কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। দশম উইকেটে প্রায় ১০ ওভার ব্যাট করে ৩২ রান যোগ করেন তারা। জিম্বাবুয়ের ইনিংসে এটিই ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। শেষ পর্যন্ত মাসাকাদজাকে ৮ রানে আটকে দেন সামি। তাতেই ১৬৯ রানে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে।
জবাব দিতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে আফগানিস্তান। চতুর্থ ওভারে ইভান্সের বলে স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে বিশাল ছক্কাসহ একের পর এক বাউন্ডারি মারেন জাদরান। এরপর আক্রমণের দায়িত্ব নেন গুরবাজ। অষ্টম ওভারে বাঁহাতি পেসার নিয়ামহুরিকে পরপর দুটি চার মারেন তিনি। পরে মুজারাবানিকে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর পর ইভান্সের বলও সীমানার বাইরে পাঠান।
তবে ধীরগতির বলে মাধেভেরের হাতে পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে থামে গুরবাজের ইনিংস। ৩১ বলে ৩৬ রান করেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ছয়টি চার ও দুটি ছক্কা। কিছুক্ষণ পর সেদিকউল্লাহ আতালকেও ফেরান নিয়ামহুরি। ৬ রান করে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দেন বাঁহাতি এই ব্যাটার।
এরপর জয়ের বাকি পথটুকু সামলান অধিনায়ক রহমত শাহ ও জাদরান। নিয়মিত এক-দুই রান নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। টানা ৭৭ বল কোনো বাউন্ডারি না এলেও জুটি ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ২৭তম ওভারে কভার দিয়ে চার মেরে বাউন্ডারির খরা কাটান রহমত। ওই ওভারেই রাজাকে চার মারেন জাদরান।
মাসাকাদজার একটি খাটো বল মিডউইকেটের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে নিজের অর্ধশতকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রহমত। তবে জয়ের জন্য যখন আর মাত্র ৮ রান প্রয়োজন, তখন শর্ট মিডউইকেটে বার্লের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন তিনি। ৬৩ বলে ৪৩ রান করেন রহমত। তার ইনিংসে ছিল একটি চার ও একটি ছক্কা।
এরপর জাদরান ও শহিদি অনায়াসেই দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ৯৬ বলের অপরাজিত ইনিংসে চারটি চার ও একটি ছক্কা মারেন জাদরান। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আফগানিস্তান, সঙ্গে নিশ্চিত করে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা।

















