• Home
  • বিনোদন
  • প্রধানমন্ত্রীর কাছে টাকা-পয়সা নয়, ১০০টি নারিকেল গাছের আকুতি প্রবীণ অভিনেতার
Image

প্রধানমন্ত্রীর কাছে টাকা-পয়সা নয়, ১০০টি নারিকেল গাছের আকুতি প্রবীণ অভিনেতার

বাংলাদেশের অভিনয় জগতের এক চিরচেনা মুখ, প্রবীণ অভিনেতা কাজী উজ্জ্বল আজ জীবনের এক কঠিন সময় পার করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতায় ভুগে এক প্রকার গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে তার বর্ণিল জীবন। বিগত কয়েক দফায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও গত এক বছর ধরে তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন তা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

জৌলুসপূর্ণ পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া এই গুণী শিল্পী আজ বিছানায় শুয়ে স্মৃতির পাতায় হাতড়াচ্ছেন তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলো। এমন এক আবেগঘন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি ভিডিও বার্তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যেখানে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে এক অভিনব ও ব্যতিক্রমী দাবি জানিয়েছেন।

ভিডিও বার্তায় কাজী উজ্জ্বলকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি নিজের অশ্রু ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো তিনি সরকারের কাছে নিজের চিকিৎসার জন্য কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক অনুদান বা সাহায্য চাননি। তার দাবিটি ছিল আর সবার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও পরিবেশবান্ধব। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তির খাতা না খুলে, দেশের মানুষের জন্য এবং পৃথিবীর ঋণ শোধ করার লক্ষ্যে ১০০টি হাইব্রিড জাতের নারিকেল গাছের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।

স্মৃতির পাতা থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে কাজী উজ্জ্বল ১৯৭৯ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’তে তিনি অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন কেবলই এক স্কুলপড়ুয়া ছাত্র। সেই কিশোর বয়সের শ্রম ও স্মৃতির অধিকার খাটিয়েই তিনি আজ তারেক রহমানের কাছে এই দাবি তোলার সাহস পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তিনি কোনো তারকা বা শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ অধিকারপ্রার্থী হিসেবে এই দাবি করছেন। দেশের প্রায় প্রতিটি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার বাবার চরিত্রে রূপদানকারী এই শিল্পী আজ এক বছর ধরে শয্যাশায়ী হলেও, মৃত্যুর আগে তার একটাই শেষ ইচ্ছা—তিনি নিজ হাতে ১০০টি গাছ রোপণ করে যেতে চান।

কাজী উজ্জ্বলের এই অনন্য সাধারণ ইচ্ছাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তা নেটিজেনদের মধ্যে এক পশলা প্রশংসার জোয়ার এনে দিয়েছে। বর্তমান যুগে যেখানে মানুষ বিপদে পড়লে রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে নিজের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধার দাবি জানায়, সেখানে একজন প্রবীণ ও অসুস্থ শিল্পী নিজের কষ্টের কথা ভুলে দেশ ও জলবায়ুর কথা ভাবছেন—এটি সমাজকে এক অনন্য বার্তা দেয়। নেটিজেনদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন, কাজী উজ্জ্বল প্রমাণ করেছেন একজন সত্যিকারের শিল্পী সব সময়ই সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। তার এই সবুজ উদ্যোগের প্রশংসা করছেন সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকেরাও।

অভিনয় জগতে আসার আগে কাজী উজ্জ্বল রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পদে সুনামের সঙ্গে কর্মরত ছিলেন। তবে আশির দশকে অভিনয়ের প্রতি এক বুক ভালোবাসা আর টান থেকে তিনি সরকারি চাকরি ইস্তফা দিয়ে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের জগতে পা রাখেন। ১৯৮৫ সালে এদেশের বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের হাত ধরে মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তার অভিনয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জনপ্রিয় নাটক ‘সুপ্রভাত ঢাকা’-তে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে দর্শক মহলে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে কাজী উজ্জ্বল প্রায় পাঁচ থেকে ছয়শ টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের বিনোদিত করেছেন। ছোট পর্দার পাশাপাশি বড় পর্দাতেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রখ্যাত নির্মাতা আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘দরিয়া পাড়ের দৌলতী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালী পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে তিনি আরও প্রায় ১৫টি চলচ্চিত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে দেশের নাট্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজের এক স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এই চিরসবুজ অভিনেতা নিজের মৃত্যুর আগে প্রকৃতির বুকে সুবজের ছোঁয়া রেখে যেতে চান, যা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ENGLISH »