নীরবে আর্ত মানুষের কতটুকু সেবা করেন বলিউডের ‘শাহেনশাহ’

0
46

কঠিন সময়ে বলিউড সুপারস্টাররা মানুষের পাশে কতটুকু দাঁড়ান?  আর্ত মানুষের সেবায় এগিয়ে না এসে শুধু অভিনয় করে মানুষের পকেটের টাকায় তাদের বিলাসী জীবন কাটানোর অভিযোগও তোলেন অনেকে।

ভয়াবহ করোনা মহামারিতে ভারত যখন বিপর্যস্ত তখন বলিউড তারকাদের অনেককেই দেখা গেছে বিদেশে গিয়ে আনন্দে অবকাশ যাপন করতে।

মানুষ যখন খেতে পাচ্ছে না, স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না তখন একেকটি সিনেমা থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করা সুপারস্টাররা কেন নীরব থাকছেন? কেন এগিয়ে আসছেন না দুস্থদের সাহায্য করতে?

হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন তারকার কথাই আমরা জানতে পারি যারা সরাসরি অবদান রাখছেন দুস্থদের সেবায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আগে যার নাম আসে, তিনি অভিনেতা সোনু সুদ। বলিউডের খান, বচ্চন কিংবা কাপুর পরিবারের বাইরের এই ‘খলনায়ক’ তার সেবা কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ের নায়কে পরিণত হয়েছেন। সালমান খানও কখনও ত্রাণ, আবার কখনও নগদ টাকা সহায়তা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। অক্ষয় কুমারসহ অনেকেই নগদ অর্থ দান করেছেন। সম্প্রতি অক্সিজেন সরবরাহও করছেন কেউ কেউ। অন্যান্য তারকাদের সহায়তা সম্পর্কেও যা জানা যায় খুব নগণ্য।

এমন অবস্থায় সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন বলিউডের মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনও। তার কোনও সহায়তার খবর মিডিয়ায় আসে না। সারাজীবন কত কোটি টাকা আয় করেছেন তিনি। আর দেশের দুর্দিনে দেশবরেণ্য অভিনেতা নিরব থাকেন কী করে? এমন আরও অনেক নোংরা ও কুরুচিকর মন্তব্যও হয়েছে বলিউডের ‘শাহেনশাহ’কে নিয়ে।

অবশেষে অনেকটা বিরক্ত হয়েই মুখ খুলেছেন অমিতাভ বচ্চন। মানুষের জন্য কী কী করেছেন তার কিছুটা জানালেন তার ব্যক্তিগত ব্লগে। তিনি স্পষ্ট করেই লেখেন, ‘প্রতিদিন নোংরা কথাবার্তা আর কুরুচিকর মন্তব্য’র শিকার হয়েছেন তিনি। টার্গেট হয়েছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা।

অমিতাভ বচ্চন জানান, একেবারেই নীরবে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা কাজ করে গেছেন। ‘শুধুমাত্র সেবাগ্রাহকরা জানতে পেরেছে। আর ঘটনা এখানেই শেষ’, বলেন বিগ বি। অর্থাৎ কোনপ্রকার প্রচার-প্রচারণা করতে নারাজ তিনি। যা করেছেন, নীরবে, নিভৃতে।

কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে অমিতাভ বচ্চন কী কী করেছেন তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন অভিনেতা নিজেই। তার ব্লগে একে একে উল্লেখ করা তার কার্যক্রম একটু দেখে নিন।

– ভারতে ঋণের দায়ভার নিয়ে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিবছরই ঘটতে দেখা যায়। করোনা পরিস্থিতিতে এমন আত্মহত্যা রোধ করতে ১৫০০-এর বেশি কৃষকের ব্যাংক ঋণ শোধ করে দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। অন্ধ্র প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানের প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ শোধ করেছেন তিনি। এজন্য সকল কৃষকের যাতায়াতের ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়া এমনকি ট্রেনভাড়ার টাকাও দিয়েছেন তিনি। অবশেষে ঋণ পরিশোধের সনদপত্র হাতে নিয়ে হাসি মুখে ফিরেছেন কৃষকেরা।

– দেশের সীমানায় যে সকল জওয়ানরা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম, তালিকা সংগ্রহ করে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন। তাদের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন।

– পুলওয়ামার সন্ত্রাসী হামলা যে জওয়ানরা শহীদ হন, তাদের পরিবারদের হাতেও তুলে দেওয়া হয়েছে সহায়তা। অমিতাভের পক্ষে এ কাজটি করেছিলেন তার সন্তান অভিষেক বচ্চন ও শ্বেতা বচ্চন।

– গত বছর করোনার প্রথম ঢেউয়ে অসহায় হয়ে পড়া দিনমজুরদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিগ বি। দেশজুড়ে চার লাখের বেশি শ্রমিককে এক মাস ধরে খাদ্য সরবরাহ করেছিলেন। এর মধ্যে মুম্বাইয়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে প্রতিদিন খাইয়েছেন ‘শাহেনশাহ’।

– স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ প্রমুখ সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধাদের কয়েক হাজার মাস্ক ও পিপিই কিট সরবরাহ করেছেন ব্যক্তিগত তহবিল থেকেই

– হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরাতে কাজ করছিল একটি শিখ সংস্থা। সেখানে তহবিল যোগান দিয়েছিলেন অমিতাভ।

– যে সকল পরিযায়ী শ্রমিক হেঁটে হেঁটে ঘরে ফিরছিলেন তাদের মধ্যে শত শত মানুষকে চপ্পল ও জুতা সরবরাহ করেন বিগ বি। উত্তর প্রদেশ ও বিহারগামী শ্রমিকদের জন্য ৩০টি বাস ভাড়া করে দেন তিনি। সেসঙ্গে খাদ্য ও পানীয় দিয়ে দেন তাদের হাতে।

– মুম্বাই থেকে উত্তর প্রদেশগামী একটি আস্ত ট্রেন ভাড়া করে দেন অমিতাভ বচ্চন। এতে চড়ে বিনা খরচায় ২৮০০ পরিযায়ী শ্রমিক গন্তব্যে যাত্রা করেন। কিন্তু নিজের রাজ্য যখন ঢুকতে বাধা দেয়, তখন ৩টি ইন্ডিগো এয়ারলাইন প্লেন ভাড়া করে যাত্রীদের উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান এবং জম্মু-কাশ্মীরে পৌছে দেন অমিতাভ।

– মহামারি ছড়িয়ে পড়লে দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদুয়ারায় একটি পূর্ণাঙ্গ ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে দেন। এর ব্যবস্থাপনা করে দিল্লি শিখ গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটি। অমিতাভ বচ্চনের নানা, নানি ও মায়ের স্মরণে সেখানে এমআরআই মেশিন ও অন্যান্য সোনোগ্রাফিক ও স্ক্যান মেশিনও কিনে দেন তিনি। আর এই পুরো উদ্যোগটাই ছিল অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের সেবার লক্ষ্যে।

– দিল্লির আরেকটি গুরুদুয়ারায় ২৫০ থেকে ৪৫০ শয্যাবিশিষ্ট করোনারোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করতে প্রয়োজনীয় টাকা দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। সেখানে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর কেনার বা সংগ্রহ করার উদ্যোগীও হয়েছেন তিনি। আগামী ১৫ মে পোল্যান্ড থেকে ৫০টি এসে পৌছাবে। আরও ১৫০টির অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আসবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর কিছু ইতোমধ্যে এসেছে এবং হাসপাতালে হস্তান্তরও করা হয়েছে।

– মুম্বাইয়ের মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালগুলোর জন্য জরুরি ভেনটিলেটর কিনে দিচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন। তারা সীমিত সামর্থের মধ্যে প্রায় ২০টি ভেনটিলেটর কয়েকদিনের মধ্যে এসে পৌঁছাবে। ইতোমধ্যে ১০টা পৌছে গেছে।

মুম্বাইয়ের জুহু সেনানিবাস এলাকায় একটি স্কুল হলে ২৫-৫০ শয্যাবিশিষ্ট এবং যাবতীয় প্রয়োজনীয় সুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করছেন। ১২ মে এটি কার্যক্রম শুরু করবে। এর তহবিল দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন।

– গত সপ্তাহে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ডিটেকশন মেশিন দান করেছেন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত নানাবতী হাসপাতালে। এটি কোভিড শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

– শহরের বস্তি ও দরিদ্র এলাকার প্রায় ১০০০ মানুষের খাদ্য যোগান দিচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন।

– মা-বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে অনাথ হয়ে পড়া অনেক শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। হায়দ্রাবাদের একটি অনাথ আশ্রমে তাদের থাকা-খাওয়া ও পড়াশুনা করানো হবে। ১ম থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের পড়াশুনার সব দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। এরপরও মেধাবী কেউ পড়াশুনা চালিয়ে যেতে চাইলে সেটারও দায়িত্ব নেবেন বিগ বি।

এরপর অমিতাভ বচ্চন জানান, এখানেই শেষ নয়। সামর্থ অনুযায়ী তার সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY