পাপুলের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, কুয়েতের নাগরিক হলে তার আসন খালি হবে: প্রধানমন্ত্রী

0
39

নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার হওয়া লক্ষীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল কুয়েতের নাগরিক কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য কুয়েতের সঙ্গে কথা বলেছি, বিষয়টি দেখবে। আর যদি এটা হয় তাহলে তার ওই সিট হয়তো খালি করে দিতে হবে। যেটা আইন আছে সেটাই হবে। তার বিরুদ্ধে এখানেও তদন্ত চলছে।’

বুধবার (৮ জুলাই) স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ এ বিষয়ে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কথা তুললে। সংসদ নেতা এ জবাব দেন।

পাপুল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে সংসদ সদস্যের কথা বলা হয়েছে সে কিন্তু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। সে কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নমিনেশন চেয়েছিল আমি কিন্তু দেইনি। সে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। নির্বাচনে ওই সিট জাতীয় পার্টিকে দিয়েছিলাম। জাতীয় পার্টির নোমান নমিনেশন পেয়েছিল সে নির্বাচন করেনি, ফলে ওই লোক জিতে আসে। এরপর আবার তার স্ত্রীকে যেভাবে হোক বানায়। কাজেই এর কিন্তু আমাদের করা না।’

সংসদ সদস্য পাপুল সম্পর্কে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখা তুলে ধরে বলেন, ‘সংসদে নির্বাচিত হবার যোগ্যতা এবং অযোগ্যতা সম্পর্কে যে বিষয়টি বিবৃতিতে রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রর আনুগত্য স্বীকার করে তাহলে সে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার যোগ্য হবে না। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও অধিকতর সংশোধন করা হয়েছিল। ২(ক) দফার পরিবর্তে নিম্নরূপ ২(ক) দফা প্রতিস্থাপিত হবে যথা ২(ক) এই অনুচ্ছেদের ২ দফার (গ) উপদফাতে যা কিছুই থাকুক না কেন কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে কিংবা অন্যক্ষেত্রে পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে এই অংশের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশ নাগরিকত্ব অর্জন করিয়েছেন বলে গণ্য হইবে না।

হারুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘এই সংসদের একজন সদস্য পাপুল। পত্রপত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন সে কুয়েতের নাগরিক হিসেবে সেখানে গ্রেফতার হয়েছে। আজকে যদি সত্যি কুয়েতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে থাকে তাহলে এই ব্যাপারে মাননীয় স্পিকার আপনাকে এই সুস্পষ্ট ব্যাখা দিতে হবে।’

কারণ নিশ্চই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য সংগ্রহ করেই বলেছেন। ইমিগ্রেশনে সে যে পাসপোর্ট ব্যবহার করে কুয়েতে গেছে, নিশ্চই সরকারি পাসপোর্ট নয়। তাহলে নিঃসন্দেহে সে বিদেশি নাগরিক। বিদেশি নাগরিক হিসেবে সে স্যারেন্ডার করে নাই। তথ্য গোপন করেছে নির্বাচনের সময়। আজকে সে এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এ ব্যাপারে সংবিধান অনুযায়ী সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা দরকার।

এছাড়া রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেই ধরেছি। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনিয়মগুলো খুঁজে বের করেছি। ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করা হয়েছে। ওই হাসাপতালের এই তথ্য কিন্তু আগে কেউ দেয়নি, জানাতে পারেনি। অন্য কেউ জানায়নি।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকেই খুঁজে বের করেছি, ব্যবস্থা নিয়েছি। র‌্যাব গেছে সেখানে, সেখান থেকে খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির মুখোমুখী করা হয়েছে। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত অন্যদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সরকারি দলীয় বেনজীর আহমদ-এর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে করোনা পরবর্তী সময়ে পুনরায় কর্মে নিয়োগ পেতে পারে সেজন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এই অন্তবর্তী সময়ে বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে আমরা দুস্থ ও কর্মহীন হয়ে পড়া প্রবাসী কর্মীদের মাঝে প্রায় ১১ কোটি টাকার ঔষধ, ত্রাণ ও জরুরি সামগ্রী বিতরণ করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার কারণে চাকুরিচ্যুত হয়ে কিংবা অন্য কোন কারণে বিদেশ ফেরত কর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য আমরা ইতোমধ্যেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনুকূলে ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করেছি। এছাড়া, করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের এবং প্রবাসে করোনায় মৃত কর্মীর পরিবারের উপযুক্ত সদস্যকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে বিনিয়োগ ঋণ প্রদানের জন্য আমরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছি। এ সংক্রান্ত নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী শুধুমাত্র বৈধ ও নিবন্ধিত অভিবাসী মৃত কর্মীর পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে-এর তহবিল হতে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। করোনা মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নির্বিশেষে সকল প্রবাসী কর্মীর পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য আমরা ৩ লাখ টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ হতে প্রবাসী শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। তবে এ চাপ প্রশমিত করার জন্য আমাদের সরকার বিভিন্নমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, চলাচলের অনুমতির বিষয়ে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং কুটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আমি কতিপয় রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের নিকট এ বিষয়ে পত্র প্রেরণ করেছি।

এছাড়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও এয়ারলাইন্সের আবেদনের প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে বিমান। ১০ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। আমাদের সরকারের গৃহীত খাদ্য ও চিকিৎসা কূটনীতির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি এবং ঔষুধ প্রেরণ করা হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমাদের প্রতিবেশি অন্যান্য দেশসমূহে যেখানে প্রায় লক্ষাধিক প্রবাসী শ্রমিক ফিরে এসেছেন, সেখানে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত মাত্র ২২ হাজার প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত সময়োযচিত কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে ফিরে আসা প্রবাসীর সংখ্যা এখনো কম রয়েছে। আমাদের সরকার ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের টেকসই পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রবাসীদের যথাযথ সহায়তা প্রদানের জন্য একটি ডাটাবেজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এছাড়া, যারা পুনরায় বিদেশে যেতে সক্ষম তাদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের বিদেশে চাকুরি ধরে রাখা, নতুন নতুন প্রফেশনে যোগদান, কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগ এবং এন্টারপ্রেইনার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সংসদ নেতা বলেন, বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে গমনাগমনের সুবিধার্থে আমরা ইতোমধ্যে কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যারাবিয়া এবং এমিরেটসকে বাংলাদেশে নিয়মিত বিমান চলাচলের অনুমতি প্রদান করেছি। তাছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঢাকা-লন্ডন রুটে বিমান চালু করা হয়েছে। মালয়েশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, করোনা চলাকালীন সময়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে প্রাপ্ত ২ লাখ ১৫ হাজার আবেদনের অধিকাংশ পাসপোর্ট মুদ্রণ করে আমরা বিদেশস্থ বিভিন্ন মিশনে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এছাড়া পাসপোর্ট না থাকার কারণে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যাতে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য যে সকল পাসপোর্ট মুদ্রণের অপেক্ষায় রয়েছে তা দ্রুত মুদ্রণ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY